অভিমানীর রাত
রেটিং: 0.0 ★ | লাইক: 2 | পাঠসংখ্যা: 163
রুমি ছিল বাঁদর গোছের মেয়ে, কথায় না, কাজে। গাছের মগডাল থেকে সে যেমন পাকা আম পেরে আনতে পারত, তেমনি পাড়ার কারো রান্নাঘর থেকে গল্প জোগাড় করত অনায়াসে। সেই ছোট থেকেই সে প্রকৃতির কোলে বড়ো হয়েছে, তাই যখনই অভিমান জমে উঠত, গাছই হয়ে উঠত তার আশ্রয়।
তবে, সেদিনের ঘটনাটা ছিল একেবারেই আলাদা।
একটা ছোট্ট কারণে প্রচণ্ড অভিমান করে সে সটান উঠে বসেছিল শ্মশান ঘেঁষা একটা করঞ্জ গাছের মগডালে। জায়গাটা সে আগেই দেখে রেখেছিল—বেশ শীতল, ছায়াঘন, আর গাছের শাখাগুলো এমনভাবে ছড়ানো যে, তার শরীর অনায়াসে আধশোয়া হয়ে থাকতে পারে।
রোদ গড়িয়ে বিকেল, বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা, তারপর গভীর রাত। একসময় রুমি নিজের অজান্তেই ঘুমিয়ে পড়ে গাছের মগডালে। হঠাৎ হুড়মুড়িয়ে ঘুম ভাঙে তার—চারদিক নিঃস্তব্ধ, কেবল শোনা যায় ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর দূরের কোনো পেঁচার হাহাকার। চারপাশে আলো বলতে কিছু নেই, শুধু দূরে কয়েকটা জোনাকি জ্বলছে, যেন মৃত আত্মাদের নিঃশব্দ চলাফেরা।
রুমির বুক ধকধক করতে থাকে। ভয়ের অদ্ভুত এক শীতল তরঙ্গ ধেয়ে আসে শরীর জুড়ে। সেই ছোট ছোট চরণে সে গাছ থেকে নিচে নামে, আর চোখে জল এনে দৌড় শুরু করে বাড়ির দিকে—ভাঙা কাঁটাঝোপ, কর্দমাক্ত পথ, বাতাসে শ্মশানের ধোঁয়া মেশানো ঘ্রাণ—সবকিছুকে পেছনে ফেলে সে ছুটে চলে।
বাড়ির কাছে এসে দেখে, সদর দরজার সামনে মা বসে কাঁদছেন, বাবা স্তব্ধ, চোখে হতাশা। যেন কেউ হৃদয়ের ভিতরটা খুঁড়ে নিয়ে গেছে। রুমি জানে, মা ভেবেছেন তাকে শিয়ালে নিয়ে গেছে—ওই গ্রামের শিয়ালগুলো এমনই, ছোটো শিশু বা গরুর বাছুর—সবই তাদের খাদ্য।
কিন্তু সে সামনে দিয়ে ঢোকার সাহস পায় না। ভয়ে, লজ্জায়, আর ভবিষ্যতের বকুনির আশঙ্কায় রান্নাঘরের পিছনের দেয়ালের ফাঁক গলে চুপিসারে ঢুকে পরে। খিদের জ্বালায় বাসনের খটখটে শব্দ করে ফেলতেই সবাই ছুটে আসে। চোখের সামনে তাকে দেখে মা যেন প্রাণ ফিরে পান, কিন্তু তাতেও রেহাই মেলে না—প্রচণ্ড বকুনি আর এক চোট পিঠে বাড়ি!
তবে সেদিনের সেই রাত, সেই গাছ, সেই পেঁচার ডাক, সেই নিঃসঙ্গতা—সব মিলিয়ে একটা কথা চিরকালের মতো শিখিয়ে দিয়েছিল রুমিকে।
অভিমান হতেই পারে, কিন্তু মায়ের কোলের মতো আশ্রয় আর কোথাও নেই।
সেই রাতে, সেই শ্মশান ছুঁয়ে ফেরা একটুকরো ভয় রুমির ভেতর থেকে সব রাগ, অভিমান, জেদ ধুয়ে মুছে দিয়েছিল।
আর তারপর থেকে, যতই রাগ হোক, যতই অভিমান জমুক—রুমি আর কখনও ‘ঘর’কে ছেড়ে কোথাও যায়নি।
No comments yet.