হ্যারিকেনের আলো
রেটিং: 0.0 ★ | লাইক: 0 | পাঠসংখ্যা: 85
সন্ধ্যা হলেই মা লণ্ঠনটা নামাতেন। পুরোনো কাঠের তাক থেকে হ্যারিকেনটা ধীরে নামিয়ে আনতেন, তারপর একে যত্ন করে মুছতেন। কাঁচের ভেতরে জমে থাকা কালো ধোঁয়া কাপড়ে ঘষে তুলে ফেলতেন। আমি আর আমার ছোট ভাই দাঁড়িয়ে থাকতাম কৌতূহল নিয়ে। হ্যারিকেনটা যেন একটা জাদুর বাক্স—অন্ধকার থেকে আলো এনে দিত মুহূর্তেই।
বাবা সন্ধ্যা ঘরে ফিরতেন চাষের কাজ সেরে। ঘামে ভেজা শরীর ধুয়ে এসে মোড়ায় বসতেন। মা কেরোসিন ঢেলে সলতেটা একটু টেনে তুলতেন। তারপর দেশলাইয়ের টোকা—"ফট্" শব্দ হতো, আর হ্যারিকেনের ভেতর ছোট্ট এক শিখা নেচে উঠত। প্রথমে টলমল আলো, তারপর আস্তে আস্তে ঝলমলে হলুদ আভা ছড়িয়ে পড়ত ঘরের চারদিকে।
সেই আলোয় আমি পড়াশোনা করেছি। কাগজের ওপর ছায়া পড়ত, আর মা মাঝে মাঝে বলতেন,
“চোখ খুব কাছে নিয়ে পড়িস না, আলো কম।”
শীতের রাতে আমাদের পুরো পরিবার হ্যারিকেন ঘিরে বসত। দাদু গম্ভীর গলায় ভূতের গল্প বলতেন—"শ্মশান কালী", "বটগাছের নিচে সাদা শাড়ির মেয়ে"… আমরা শিহরিত হয়ে শুনতাম। ভয় পেলে মা হাসতে হাসতে বলতেন,
“কিছু না রে, আলোটা যতক্ষণ আছে, কিছুই হবে না।”
বর্ষার দিনে হ্যারিকেনের ভূমিকা আরও বড় হয়ে উঠত। বাইরে ঝড়, বৃষ্টি, বজ্রপাত। বাতাসের ধাক্কায় জানালা কেঁপে উঠত, আর ঘরের ভেতরে হ্যারিকেনের আলো দপদপ করত। মনে হতো—অন্ধকারের বিশাল সাগরে আমাদের এই ছোট্ট আলোটাই যেন একমাত্র ভরসা।
হ্যারিকেনের আলো শুধু ঘর উজ্জ্বল করত না, আমাদের মনও উজ্জ্বল করত। বিদ্যুতের মতো চড়া নয়, বরং ছিল কোমল, শান্ত, আপন। সেই আলোয় মা ভাত পরিবেশন করতেন, বাবা চুপচাপ বসে বিড়ি ধরাতেন, আমরা দুই ভাই খাতায় অঙ্ক কষতাম। জীবনের সেই সরল মুহূর্তগুলোই আজ এত মূল্যবান মনে হয়।
এখন সর্বত্র বিদ্যুতের ঝলকানি, এলইডি লাইটে চোখ ঝলসে যায়। কিন্তু সেই হ্যারিকেনের মৃদু, কুণ্ডলিত আলোতে যে উষ্ণতা ছিল—তা আর কোথাও নেই।
আমার কাছে হ্যারিকেন শুধু একটা লণ্ঠন নয়,
এটা আমার শৈশবের অন্ধকার ভেদ করা সূর্যের টুকরো,
আমার গ্রামের রাতের হাসি-কান্নার একমাত্র সাক্ষী।
No comments yet.