আলোকনগর
রেটিং: 0.0 ★ | লাইক: 0 | পাঠসংখ্যা: 48
১
রাত তখন প্রায় সাড়ে দশটা। সুপ্রিয় ঘোষ ট্রেন থেকে নেমে হাঁটছিলেন ছোট একটা স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম ধরে। নামটা পড়লেন—"আলোকনগর"।
অদ্ভুত ব্যাপার, এমন নামের কোনো স্টেশনের কথা তিনি কখনো শোনেননি, অথচ টিকিটে ঠিক ঠিক এই নামটাই লেখা!
চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। শুধু একটা কুয়াশাময় বাতি ঝিমঝিম করে জ্বলছে। আশপাশে কেউ নেই। হঠাৎ মনে পড়ল, বুকিং ক্লার্ক বলেছিল, “এই শহরে না গেলে আপনি আপনার প্রশ্নের উত্তর কখনো পাবেন না।”
সুপ্রিয় একজন লেখক। মাঝবয়সী, সফল, কিন্তু ভেতরে কোথাও যেন একটা শূন্যতা। একটা প্রশ্ন বহু বছর ধরে তাঁকে তাড়িয়ে ফিরছে—“আমি কে? আমি আসলে কী চাই?”
২
স্টেশন থেকে বেরিয়ে তিনি হাঁটতে শুরু করলেন। আশ্চর্য, পুরো শহরটা নিস্তব্ধ, কুয়াশায় মোড়া, কিন্তু কোথাও কোনো অস্বস্তি নেই। বরং একটা শান্তি, একটা অদ্ভুত টান যেন তাঁকে ভেতরে ভেতরে টেনে নিচ্ছে।
হঠাৎ দেখতে পেলেন—একটা পুরোনো বাড়ি, যেন বহু বছর ধরা কেউ ব্যবহার করেনি, অথচ জানালার পর্দা দুলছে।
দরজায় কড়া নাড়তেই খুলে গেল নিজে থেকেই।
ভিতরে ঢুকেই তিনি দেখতে পেলেন, দেয়ালের গায়ে অনেকগুলো ছবি—কিন্তু সবগুলো ছবিতেই রয়েছে সুপ্রিয় নিজেই! কখনো ছোটবেলায় কাঁদছে, কখনো স্কুল জীবনের একা বসে থাকা, কখনো বিয়ের পর স্ত্রীর চোখে অভিযোগ...
তিনি স্তম্ভিত!
৩
এক বৃদ্ধ এসে দাঁড়ালেন তাঁর সামনে। চোখে ভারী চশমা, মুখে রহস্যময় হাসি।
— "তুমি এসেছো, এই শহর শুধু তাদের জন্য, যারা নিজের ছায়াকে খুঁজতে চায়।"
— "ছায়া?"
— "তুমি যা ছিলে, যা হতে চেয়েছিলে, আর যা হয়নি—সবই এই শহরে আছে। তুমি দেখতে চাইলে, আমরা দেখাবো।"
তারপর সুপ্রিয়কে নিয়ে যাওয়া হলো এক কাচঘরের ভেতর। সেখানে প্রত্যেকটা ঘরে তার জীবনের একেকটা অপূর্ণ অধ্যায়। যেমন—
একটি ঘরে সে একজন সঙ্গীতশিল্পী, যেমনটা সে ছোটবেলায় হতে চেয়েছিল।
আরেক ঘরে সে গ্রামে শিক্ষকতা করছে—যেখানে একসময় সে স্বপ্ন দেখেছিল পড়াতে যাবে।
কোথাও সে লেখক নয়, বরং একজন সাধারণ পরিবারপ্রেমী মানুষ।
প্রতিটি জীবন সম্পূর্ণ, সুন্দর, অথচ তার বর্তমান জীবনের সঙ্গে একেবারেই আলাদা।
৪
সুপ্রিয় হতবাক।
— "তাহলে আমি কি ভুল করে এসেছি এতদূর?"
— বৃদ্ধ বললেন, "না। তুমি শুধু ভুলে গিয়েছিলে নিজের মনে করা আমি আর হওয়া আমি-র তফাত।"
— "তবে এখন কী করবো?"
— "এখান থেকে চলে যেতে পারো, অথবা নিজের ছায়ার সঙ্গে মুখোমুখি হও। সব প্রশ্নের উত্তর পাবে। কিন্তু প্রস্তুত থাকতে হবে।"
সুপ্রিয় জানত, ফিরে গেলে জীবন আগের মতই চলবে—নির্বিকার, সফল কিন্তু ফাঁকা।
সে কাচঘরটায় দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকাল।
আর তখনই... আলো নিভে গেল।
৫
পরদিন সকালে এক লোক স্টেশনের পাশে অচেতন এক ব্যক্তিকে খুঁজে পায়। ডাক্তার ডাকা হয়।
লোকটি চোখ খুলে তাকিয়ে বলে—"আমি আলোকনগরে গিয়েছিলাম… আমি নিজের ছায়াকে দেখেছিলাম।"
ডাক্তার হেসে বললেন, “এই জায়গার নাম তো আলোপাথাড়ি… আলোকনগর বলে কিছুই নেই এখানে।”
সুপ্রিয় মৃদু হেসে চোখ বন্ধ করলেন।
তিনি জানতেন, ছায়ার শহর কে কখনো খুঁজে পায় না—সে শহর নিজেই কাউকে ডাকে।
No comments yet.