অত্যাশ্চর্য - হৃদয়স্পর্শী গল্প | বাংলা গল্প

অত্যাশ্চর্য

রেটিং: 0.0 ★ | লাইক: 2 | পাঠসংখ্যা: 187

বিয়ের সাত বছর পর সুখবরটা এলো। সন্তান লাভের আশায় বিভিন্ন ঠাকুর বাড়ি ঘুরে বেড়িয়েছে। দেবদেবীর পায়ে কতো মাথা কুটে মরেছে। তুকতাক, ফুঁকফাঁক, মাদুলি, তাবিজ, কবজ নিষ্ঠা ভরে ধারণ করেছে। ফুল, ফল, পাতা, শিকড়-বাকড়, মাটি — সব গুলে খেয়ে হজম হয়ে গেছে। তবুও সন্তান সুখ লাভ করতে পারেনি, একসময় সব আশাও ত্যাগ করে দিয়েছে ওরা।

অবশেষে তাদের ঘর আলো করে সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার অপেক্ষায়। শুনে, রমা ও রতন আনন্দে আত্মহারা। রতন প্রামানিক গ্রামের একজন মধ্যবিত্ত কৃষক। জমিজমা ও আছে বেশ কিছু। তাতে চাষবাস করে দিব্যি চলে যায়। রতন নিজের হাতেই নানা রকম সবজি ফলায়, তার হাতের যাদুতে ফলন হয় প্রচুর। এই কারণে অন্যান্য কৃষকেরা ওকে একটু হিংসেই করে। অনেকে আবার তার কাছে চাষবাসের ব্যাপারে নানাবিধ পরামর্শও নেয়।

নির্দিষ্ট সময়ে রমার কোল আলো করে ফুটফুটে এক কন্যা সন্তান এলো। আদর করে মেয়ের নাম রাখল মৌটুসী। রতন মেয়ের আদর যত্নের কোনো ত্রুটি রাখে না। মৌও একটু আদুরীপনা হয়েছে, হাজারটা বায়নাক্কা তার। মা-বাবাও তাদের আদরের সবেধন নীলমনির, সেই সব বায়নাক্কা হাসি মুখে সামলায়।

একদিন হাসপাতাল থেকে একটা বোন এনে দেওয়ার বায়না ধরে। মা রমা হেসে বলে —
“বোন আনলে কি করবি?”
মৌ উত্তর দেয় —
“বোনের সঙ্গে খেলা করবো, অনেক আদর করবো, একসঙ্গে ঘুমাবো, কত্তো মজা করবো বোনের সঙ্গে।”
মা বলে —
“তাহলে তোর আদর যত্ন কমে যাবে, তোর খাবার অর্ধেক ভাগ হয়ে যাবে, তোর কষ্ট হবে না?”
মৌ হেসে বলে —
“ধূর! আমার আদর যত্ন আরো বেড়ে যাবে, বোনও তো আমায় ভালোবাসবে।”

মা আর কোনো কথা বলতে পারে না। একদিন মৌ ধড়ফড়িয়ে ঘুম থেকে উঠে, বিছানা, খাটের তলা, আশেপাশে কি যেন খুঁজছে। মা জিজ্ঞেস করে —
“কি খুঁজছিস?”
মৌ বলে —
“বোনকে খুঁজছি, আমি হাসপাতাল থেকে হাত ধরে বাড়িতে নিয়ে আসলাম যে, আমার পাশেই শুয়েছিল, এখন নেই! কোথায় গেলো?”
রমা মেয়েকে কোলে নিয়ে আদর করে বলে —
“তুই স্বপ্ন দেখেছিস মা।”

মৌয়ের একটু মন মরা হয়ে গেল। এই ঘটনার কয়েক দিন পর, হঠাৎ করে রমার শরীর ভীষণ খারাপ করতে থাকে। শুনে, রতন তড়িঘড়ি ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়। অনেক ডাক্তারি পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা গেল রমা আবারও সন্তানসম্ভবা।

মৌয়ের দশ বছরের জন্মদিনের দিন, জন্ম হয় রমার দ্বিতীয় কন্যা সন্তানের। মৌ ভীষণ খুশি বোনকে দেখে, আদর করে নিজের নামের সাথে মিলিয়ে নাম রাখল ফুলটুসি।

দুই বোন বেশ আদর যত্নে মানুষ হতে লাগলো। মৌটুসী যতোটা শান্ত প্রকৃতির, ফুলটুসি ততোধিক দুষ্টু মেয়ে। দুজন দুজনকে ভীষণ ভালোবাসে। আবার একটা অদ্ভুত ব্যাপার হলো, একজনের শরীর খারাপ হলে কয়েক ঘন্টার মধ্যে অন্য বোনও অসুস্থ হয়ে পড়ে। বাবা-মায়ের নাজেহাল অবস্থা হয় তখন — কীভাবে দুই বোনকে সামলাবে, ভেবে পায় না।

মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী সবাই অবাক হয়ে যায় ওদের একে অপরের প্রতি অদ্ভুত টান আর শরীর খারাপের বহর দেখে। কারণ অনুসন্ধান করতে কলকাতার বড়ো হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় ওদের। সেখানে নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা যায়, মৌটুসী আর ফুলটুসি জমজ সন্তান।

অবাক হয়ে রতন ডাক্তারবাবুকে জিজ্ঞেস করে —
“সেটা কি করে সম্ভব?”

এর উত্তরে ডাক্তার বাবুরা যে ব্যাখ্যা দিলেন শুনে তাজ্জব হয়ে যায় রতন। মৌ আর ফুলি জমজ বোন, একই ডিম্বাণুতে জন্ম ওদের। মৌ ম্যাচিওর হয়ে দশ বছর আগে জন্ম নেয়, আর ফুলি সুপ্ত ভ্রুণ হয়ে থেকে যায় মায়ের গর্ভেই। এরপর তিলে তিলে বড়ো হয়ে জন্ম নেয় দশ বছর পর। এটি একটি বিরলের মধ্যে বিরলতম ঘটনা — সারা পৃথিবীতে হাতে গোনা কয়েকটি মাত্র এমন ঘটনা ঘটেছে বলে জানা যায়। ওদের সাবধানে রাখার পরামর্শ দেন তাঁরা।

মৌয়ের যখন আঠারো বছর বয়স, ওর সম্বন্ধ ঠিক হয় পাশের পাড়ার একটা বনেদি পরিবারে। বেশ ধুমধাম করেই বিয়ে হয়। ফুলি প্রায় প্রতিদিন মৌয়ের সঙ্গে দেখা করতে যায় ওর শশুরবাড়িতে। মৌয়ের মিষ্টি স্বভাবের কারণে শশুরবাড়িতে সবাই মৌকে মাথায় করে রাখে।

বছর খানেক পর মৌ সন্তান ধারণ করে। মৌয়ের যত্ন-আত্তিরও কয়েক গুণ বেড়ে যায়, বিশেষ করে স্বামী ও শশুর-শাশুড়ির কাছে। মৌ-ফুলির জন্মদিন আসন্ন। সেই উপলক্ষে স্বামী রাজীব সরকার ঠিক করে দুই বোনের জন্মদিন একসঙ্গে বেশ জাঁকজমক করে পালন করবে ওদের বাড়িতে। সব আয়োজনও করে ফেলে সে।

হঠাৎই মৌয়ের শরীর খারাপ করে। তাকে প্রথমে গ্রামীণ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ওখানের ডাক্তারবাবু দেখে কলকাতায় রেফার করে দেন। বাড়ির লোকেরা ঝুঁকি না নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে মৌকে কলকাতার বড়ো হাসপাতালে নিয়ে যায়। ডাক্তারবাবু মৌকে পরীক্ষা করে দেখে, জবাব দিয়ে দেন —
“She is no more!!”

গ্রামের বাড়িতে তখনও খবরটা এসে পৌঁছয়নি। এদিকে ফুলি পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে খেলা করছিল। হঠাৎই ছুটে বাড়ি চলে এসে মাকে জানায় তার প্রচন্ড পেটে ব্যথা করছে, শরীরটা ভীষণ খারাপ লাগছে। পাড়া-প্রতিবেশীদের ডেকে মা রমা ফুলিকে গ্রামীণ হাসপাতালে নিয়ে যায়। ওই গ্রামীণ হাসপাতালে কয়েক ঘন্টার মধ্যে ফুলিও মারা যায়।

সেদিন ছিল মৌ-ফুলির জন্মদিন। আর আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো, ওই দিনই ওদের মৃত্যুদিনও!!

Comments

Please login to post a comment.

No comments yet.

সাম্প্রতিক গল্প

অমৃতফুলের সন্ধান

অমৃতফুলের সন্ধান

By apuguin in রূপকথার গল্প

(0.0) ❤️ 0 👁️ 315
অদৃশ্য লাইব্রেরি

অদৃশ্য লাইব্রেরি

By apuguin in জীবনমুখী গল্প

(0.0) ❤️ 0 👁️ 52
হ্যারিকেনের আলো

হ্যারিকেনের আলো

By apuguin in হৃদয়স্পর্শী গল্প

(0.0) ❤️ 0 👁️ 85