বাবার পুরনো ঘড়িটা
রেটিং: 0.0 ★ | লাইক: 0 | পাঠসংখ্যা: 59
সাত বছর হয়ে গেল — বিদেশে চাকরি, ব্যস্ততা, প্রোমোশনের দৌড়। তবু কোথাও একটা শূন্যতা জমে আছে।
ট্রেনটা জলপাইগুড়ির স্টেশনে থামতেই সৌরভের বুকের ভেতর কেমন যেন চাপ চাপ লাগে।
এই শহর, এই গন্ধ, এই ছায়ায় মোড়া দুপুরগুলো — সবকিছুই কোনো না কোনোভাবে তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় বহু বছর আগের সেই চেনা উঠোনে।
কিন্তু আজ সে নিজের বাড়িতে ফিরছে না।
আজ সে যাচ্ছে এক বৃদ্ধাশ্রমে — তার বাবার কাছে।
তিন বছর আগের গল্প…
মা মারা যাওয়ার পর বাবা একা হয়ে পড়েছিলেন।
সৌরভ তখন মুম্বইয়ে, সেখান থেকে চাকরির সুযোগ আসে লন্ডনে।
বিদেশ যাওয়ার আগে বাবা বলেছিলেন, "তুই যা, আমি ঠিক আছি।"
তবু সৌরভ একটা পরিচিত বৃদ্ধাশ্রমে ব্যবস্থা করে দেয়।
বলে, “বাবা, ওখানে ভালো থাকবে, ডাক্তার আসবে নিয়ম করে, আমি সুযোগ পেলেই আসব।”
বাবা তখন কিছু বলেননি।
শুধু একটু হেসেছিলেন। সেই শান্ত, ধৈর্যভরা হাসি।
ফিরে দেখা...
আজ সৌরভ বৃদ্ধাশ্রমে ঢুকে পড়ে।
ঘরে ঢুকতেই চোখে পড়ে সেই পুরনো দেয়াল ঘড়িটা।
সেটা তার মা'র পছন্দের ছিল না, কিন্তু বাবা সেটার সময় সবসময় ঠিক রাখতেন।
মায়ের মৃত্যুর পর প্রতিদিন নিজে হাতেই পরিস্কার করতেন — যেন সময়টুকু ঠিক রাখলে, জীবনটাও ঠিক থাকবে।
বিছানায় বসে থাকা মানুষটা এখনো তার বাবা।
কিন্তু বয়স যে ছাপ রেখে গেছে শরীরে, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই।
সাদা চুল, কুঁচকে যাওয়া গাল, একজোড়া ঝাপসা চোখ — কিন্তু সেই চোখেই একটা শান্ত আলো এখনো জ্বলছে।
সৌরভ এগিয়ে যায়।
কোনো জড়তা ছাড়াই বাবা বলে ফেলেন:
“এসেছিস... ভালো লাগল।
তবে তুই যেমন ছিলি, এখনও ঠিক তেমনই — খুব ব্যস্ত।”
তারপর আবার সেই চেনা হাসিটা।
যেটা একসময় সৌরভকে সাহস দিত, আজ যেন গ্লানিতে পোড়া।
সৌরভ কথা খুঁজে পায় না।
ব্যাগ খুলে একটা দামি ঘড়ি বের করে বাবার হাতে দেয়।
একটা ব্র্যান্ডেড ডিজিটাল ঘড়ি — স্ক্রিন, সেন্সর, সব আছে।
বাবা ঘড়িটা দেখে একটু হেসে বলেন:
“নতুন ঘড়ি ভালো...
কিন্তু আমি এখনো পুরনোটার দিকেই তাকাই।
তুই সময় দিলি না, ঘড়ি দিয়ে কী হবে বল?”
ঘড়ি টিক টিক করে চলে,
কিন্তু কোনো সম্পর্কের বন্ধন যদি থমকে যায়,
তাহলে সেটা শুধু সময় নয় — একটা জীবন পিছিয়ে পড়ে চুপচাপ।
❝এই গল্পটা শুধু সৌরভের নয়,
এটা তাদের সবার,
যারা সময়ের ঘড়ি চালিয়ে রাখতে রাখতে
আপন মানুষদের হারিয়ে ফেলে।❞
No comments yet.