চায়ের দোকানের রংচটা বেঞ্চ - হৃদয়স্পর্শী গল্প | বাংলা গল্প

চায়ের দোকানের রংচটা বেঞ্চ

রেটিং: 0.0 ★ | লাইক: 0 | পাঠসংখ্যা: 130

সন্ধ্যা সাতটা। কলকাতার উত্তরের এক পুরনো গলি। পাশে একটা ছোট্ট চায়ের দোকান। দোকানের সামনে একটা পুরনো কাঠের বেঞ্চ—যেটার পায়ে কালি লেগে গেছে, পেছনের ডাঁটিটা ভাঙা, তবুও কেউ ফেলে দেয়নি। এই বেঞ্চে প্রতিদিন সন্ধ্যায় বসে একজন বৃদ্ধ আর একজন তরুণ। বৃদ্ধর নাম গোপাল চক্রবর্তী। বয়স ৭২। একা থাকেন। ছেলে বিদেশে, মেয়ে শ্বশুরবাড়ির রাজ্যে। তরুণের নাম অর্জুন। বয়স ২২। সদ্য কলেজ শেষ করেছে, চাকরি খুঁজছে। বাবা মারা গেছেন, মা সেলাইয়ের কাজ করেন। দুজনের জীবন দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে, কিন্তু তবু যেন কোথাও মিল আছে—দুজনেই একা। প্রথম দেখা হয়েছিল একদিন বৃষ্টির মধ্যে। অর্জুন ভিজে চায়ের দোকানে ঢুকেছিল। ভেতরে বসে ছিলেন গোপালবাবু, মাথায় ছাতা নেই, কিন্তু চায়ে চুমুক দিচ্ছেন নির্বিকার। অর্জুন হেসে বলেছিল, 'চা তো গরম, কিন্তু আপনার পাঞ্জাবিটা তো ঠান্ডা খাচ্ছে!' গোপালবাবু হেসে বলেছিলেন, 'বয়স হলে গরম-ঠান্ডা কিচ্ছু গায়ে লাগে না। শুধু মনে লাগে।' সেদিন থেকে শুরু। প্রতিদিন সন্ধ্যায় দু’জনে বসে চা খায়, গল্প করে। গল্প হয় রবীন্দ্রনাথ, ক্রিকেট, সিনেমা, কলেজ লাইফ—সব নিয়ে। গোপালবাবু বলেন, 'তুই আমার ছেলে হলে বোধহয় আমি একটু কম একা থাকতাম।' অর্জুন বলে, 'আপনার মতো লোক যদি বাবার জায়গায় থাকতেন, আমার জীবনটা অন্যরকম হতো।' বয়সের ব্যবধান, জীবনের অভিজ্ঞতা—সব কিছু ভুলে গিয়ে তারা বন্ধুত্ব খুঁজে পায়। একদিন… অর্জুন এল চায়ের দোকানে, কিন্তু গোপালবাবু নেই। দোকানদার বলল, 'ভোরে হাসপাতাল নিয়ে গেছে, নাকি হার্টের সমস্যা।' অর্জুন ছোটে হাসপাতালে। ডাক্তার বলেন—'বয়স হয়েছে। খুব বেশি স্ট্রেস নিতে পারবেন না। ওনাকে মন ভালো রাখার চেষ্টা করুন।' সেইদিন সন্ধ্যায় অর্জুন এসে হাসপাতালের বিছানায় বসে গোপালবাবুর হাত ধরে বলল—'চায়ের দোকানের বেঞ্চে আপনি ছাড়া একেবারে ফাঁকা লাগে, জানেন তো?' গোপালবাবুর চোখে জল এসে যায়। 'তুই না এলে আমি আজ আর চোখ খুলতাম না বোধহয়...' পরবর্তী কিছু মাস… গোপালবাবু সুস্থ হন, অর্জুন চাকরি পায়। অর্জুন অফিসে জয়েন করার প্রথম দিন সকালে গোপালবাবুর পায়ে হাত দিয়ে বলে—'আপনিই তো আমার জীবনের সবচেয়ে বড় গাইড। আশীর্বাদ দিন।' গোপালবাবু বলেন—'বন্ধুদের আশীর্বাদ নয়, হাত শক্ত করে চেপে ধরা যায়। আয়, এক কাপ চা খেয়ে যাস।' চায়ের দোকানের সেই রংচটা বেঞ্চে দু'জন আবার চা খাচ্ছে। শহর বদলাচ্ছে, রাস্তা বদলাচ্ছে, কিন্তু কিছু সম্পর্ক থেকে যায় ঠিক তেমনি— সহজ, নীরব, অথচ গভীর। মানুষের জীবনে যাঁরা আসে, তাঁরা সবসময় আপন নয়, কিন্তু কেউ কেউ ধীরে ধীরে আপন হয়ে ওঠে, ঠিক রংচটা বেঞ্চটার মতো—যেখানে বসে থাকলেই শান্তি লাগে। গল্পের শিক্ষা: বন্ধুত্বের জন্য বয়স, পেশা বা রক্তের সম্পর্ক লাগে না—লাগে হৃদয়।

Comments

Please login to post a comment.

No comments yet.

সাম্প্রতিক গল্প

অমৃতফুলের সন্ধান

অমৃতফুলের সন্ধান

By apuguin in রূপকথার গল্প

(0.0) ❤️ 0 👁️ 315
অদৃশ্য লাইব্রেরি

অদৃশ্য লাইব্রেরি

By apuguin in জীবনমুখী গল্প

(0.0) ❤️ 0 👁️ 53
হ্যারিকেনের আলো

হ্যারিকেনের আলো

By apuguin in হৃদয়স্পর্শী গল্প

(0.0) ❤️ 0 👁️ 88