চিঠিটা এসে পৌঁছায়নি…
রেটিং: 0.0 ★ | লাইক: 0 | পাঠসংখ্যা: 51
গায়ে পুরনো ধুতি, পাতলা ফাটা চাদর, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা—আর মুখে এক চিরচেনা অপেক্ষার ছায়া। সে কাকু যিনি এক সময় এই গ্রামের স্কুলে হেডমাস্টার ছিলেন। যাঁর বকুনিতে যেমন ভয় ছিল, তেমনি তাঁর ভালোবাসায় ছিল এক অন্যরকম ঘোর।
গ্রামের লোকজন বলেন—“রঘুনাথ কাকুর ছেলে অরিন্দম শহরে বড় চাকরি করে। আমেরিকা নাকি গেছে। বউ-বাচ্চা সব ওখানেই। ছেলেকে কত ভালোবাসতেন কাকু! কিন্তু কবে যে শেষবার ফিরেছিল, মনেও পড়ে না ঠিকমতো।”
প্রতি রবিবার রঘুনাথ কাকু পানের বাক্স খুলে একটা নতুন করে চিঠি লেখেন অরিন্দমকে। লিখেন—
“খুব ভালো থেকো বাবা। এবার আসবি তো? তোর মা’র বাগানে শিম ফুল ধরেছে... তোদের গল্প করতে করতে দুপুর পেরিয়ে যায়…”
কিন্তু সেই চিঠি কোথাও যায় না। কাকু যত্ন করে সেগুলো এক একটা খামে ভরে রাখেন। কাঁপা হাতে ঠিকানা লেখেন… তারপর বালিশের নিচে লুকিয়ে রাখেন।
একবার পোষ্টম্যান বলেছিল—
“কাকু, চিঠি দিচ্ছেন না কেন?”
কাকু মুচকি হেসে বলেছিলেন—
“ও নিজেই ঠিক পেয়ে যাবে… ও জানে আমি এখনও লিখি।”
যেদিন ওর মা মারা গেল, অরিন্দমকে খবর দিয়েছিল গ্রামের সবাই। কিন্তু কাকু শুধু বলেছিলেন—
“তাকে আর দোষ দিও না। সময়ের অভাব সবার হয়।”
সেদিন সন্ধ্যায় গ্রামের ছোট্ট ছেলেটা—ঝন্টু এসে কাকুকে জিজ্ঞেস করেছিল—
“কাকু, তোমার ছেলে তো ফোন করে না, তাও তুমি কেন এত চিঠি লেখো?”
কাকু একটু হাসলেন। চোখে জল ছিল না, কিন্তু মৃদু কাঁপন ছিল গলায়। বললেন—
“চিঠি তো আমি ওকে লেখি না রে, আমি নিজেকেই লিখি। যেন ভুলে না যাই—ওকে কতটা ভালোবাসি…”
সন্ধ্যার পর কাকু আর বাড়ি ফেরেন না। রাত নামে… এক এক করে সব ঘর আলো নিভিয়ে ফেলে…
শুধু সেই চিঠিগুলো থেকে যায়, বালিশের নিচে গা ছমছমে নীরবতায়।
আর আমরা, যারা বাইরে থেকে গল্পটা দেখি, তাদের মন বলে—
“না, গল্পটা এখানেই শেষ হবার কথা ছিল না… হয়তো কোনো এক রবিবার… একটা উত্তর আসবে…”
No comments yet.