ডাস্টবিনের পাশে
রেটিং: 0.0 ★ | লাইক: 0 | পাঠসংখ্যা: 37
১
প্রতিদিন সকালে কাকডাকা ভোরে একটা মানুষ রাস্তার ধারে ডাস্টবিনের পাশে দাঁড়ায়।
নোংরা জামাকাপড়, পলিথিনে মোড়া শরীর, একহাত পেছনে বাঁকা হয়ে গেছে—বয়স পঞ্চাশ কি তারও বেশি।
নাম কেউ জানে না, কেউ জানতে চায়ও না।
সবাই তাকে “কুড়ানেওয়ালা” বলে ডাকে।
সবার ঘুম যখন গভীর, সে তখন নিঃশব্দে শহরের নোংরার রাজা। কে কী ফেলল—খাবারের উচ্ছিষ্ট, ফাটা জামা, ছেঁড়া বই, প্লাস্টিক, ভাঙা খেলনা—সবকিছুর খবর তার জানা।
তার পিঠে ঝোলানো ব্যাগটা যেন একটা টাইম ক্যাপসুল—সমাজ যা ফেলে দেয়, সে তা সযত্নে তুলে রাখে।
২
একদিন এক বাচ্চা ছেলে—নাম রাহুল, স্কুলে যাওয়ার পথে ডাস্টবিনের পাশে লোকটিকে দেখতে পেল।
লোকটি একটা ছেঁড়া বাংলা গল্পের বই কুড়িয়ে নিয়ে মন দিয়ে পড়ছে।
রাহুল অবাক!
পরদিন সে নিজের ছোটবেলার পুরোনো গল্পের বইগুলো একটা ব্যাগে ভরে এনে লোকটার সামনে রাখল।
লোকটা চমকে তাকাল। রাহুল বলল, “এইগুলো তোমার জন্য।”
লোকটা চুপ করে রইল, তারপর ধীরে ধীরে বলল—
“ধন্যবাদ। তুমি জানো, আমি একসময় স্কুল মাস্টার ছিলাম। কিন্তু একটা ভুল... একটা বিশ্বাসঘাতকতা... সবকিছু নিয়ে গেল। এখন এই বইগুলোর মধ্যেই আমি আমার পুরোনো সত্তা খুঁজি।”
৩
রাহুল প্রতিদিন সকালে কিছু না কিছু নিয়ে আসত—কখনও খাবার, কখনও পুরনো কাগজ, আবার কখনও শুধু একটা হাসি।
তাদের এক অসম বন্ধুত্ব গড়ে উঠল।
এদিকে লোকটা ধীরে ধীরে রাস্তায় বই পড়া শুরু করল, যেকেউ কাছে এলে জিজ্ঞেস করত—
“তুমি জানো জীবনে তুমি কী হতে চাও?”
লেখা, পড়া, শেখা—সব ভুলে যাওয়া মানুষদের আবারও প্রশ্ন করতে শিখিয়েছিল লোকটা।
লোকেরা শুরুতে উপহাস করত, তারপর একদিন বুঝল—এই লোকটার মাথায় বিদ্যা আছে, চোখে সত্য আছে, আর কথায় ব্যথা।
৪
একদিন হঠাৎ লোকটা আর এল না।
ডাস্টবিনের পাশে পড়ে রইল তার পুরোনো ব্যাগটা, আর একটা চিরকুট—
"সমাজ ফেলে দেয় যে জিনিসগুলো, সবই নষ্ট নয়। কেউ কেউ হয়ত শুধু জায়গা খুঁজে পায়নি। ধন্যবাদ সেই ছোট ছেলেটিকে, যে আমায় আবার মানুষ হিসেবে দেখেছিল। আমি চললাম, আবার নতুন করে শুরু করতে।"
লোকটা কোথায় গেল, কেউ জানে না।
কিন্তু আজও সকালে অনেকেই দাঁড়ায় সেই ডাস্টবিনের পাশে,
কারণ সেখানে একসময় একটা "মানুষ" ছিল—
যে শিখিয়েছিল,
“মানুষ ফেলে দেওয়া জিনিস নয়।”
শেষ।
No comments yet.