ঘর জামাই
রেটিং: 0.0 ★ | লাইক: 2 | পাঠসংখ্যা: 1096
নীলার সঙ্গে নীলয়ের পরিচয় কলেজে। নীলয় গ্রাজুয়েশান কমপ্লিট করেছে, ওদিকে নীলা কলেজে প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছে। একই ট্রেনে ফিরছে ওরা। নীলাকে কলেজে দেখছিল নীলয়। ও পরিচয় করতে নিজেই এগিয়ে গেল।
--হ্যালো, আমি নিলয়। তোমার নাম জানতে পারি?
-- আমি নীলা। এই বছর কলেজে ভর্তি হয়েছি।
-- খুব ভালো। আমার এই বছর কলেজে শেষ। গ্রাজুয়েশান কমপ্লিট করেছি।
-- আপনার বাড়ি কোথায়?
-- বর্ধমানে। তুমি?
-- আমি দুর্গাপুরে থাকি। কিন্ত আপনার সঙ্গে আর দেখা হবে না।
-- হ্যাঁ, সেটা অবশ্য ঠিক।
সেদিন আর বেশি কথা হয় নাই। কয়েকদিন পর নীলয় সার্টিফিকেট আনতে কলেজে গেলে, নীলার সঙ্গে আবার দেখা হয়।
-- কেমন আছো নীলা?
-- ভালো আছি নীলয়দা? আপনি কেমন আছেন?
-- ভালো, সার্টিফিকেট নিতে এসেছিলাম। যদি ক্লাস না থাকে তবে কফি সপে যাবে আমার সঙ্গে?
-- বেশতো চলুন, এখন ক্লাস নেই।
সেদিন কফি সপে দু'জন যেন হারিয়ে গেলো। আপনি থেকে কখন যে তুমিতে নেমে এলো নীলা জানে না। নীলা বলল --
-- নীলয়দা কয়টা বাজে দেখেছ? আমার সব ক্লাস আজ মিস হয়ে গেলো।
-- সরি নীলা, তোমার অনেক ক্ষতি করে দিলাম?
-- ইটস ওকে, কোনো ব্যাপার না, বান্ধবীদের কাছে নোটস নিয়ে নেবো। চলো, দেরি হলে ট্রেন পাবো না।
-- হ্যাঁ, হ্যাঁ চলো।
ওরা ট্রেনে চেপে বাড়ি ফিরে এলো। তারপর থেকে নীলয় প্রায়ই নীলার সঙ্গে দেখা করতে কলেজে যায়। প্রণয়ের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। নীলা বলে --
--- নীলয়দা তুমি কি আমাদের সম্পর্কের কথাটা বাড়িতে বলেছো?
-- না নীলা, এখনো বলি নাই।
-- কবে বলবে? তুমিতো জানো আমি বাড়ির একমাত্র মেয়ে। তাই বাবা-মা আমাকে শ্বশুরবাড়ি যেতে দেবে না। বলেছে, তোর যদি কাউকে পছন্দ হয়, তাহলে তাকে এই বাড়িতে ঘর জামাই হিসেবে থাকতে হবে। তোমার কোনো আপত্তি নেইতো?
নীলয় একটু চুপ থেকে বলল --
-- না নীলা, আমি তোমাকে ভীষণ ভালোবাসি। তুমি যা চাইবে সেটাই হবে।
-- আমার বাবা ভালো মানুষ, তবে মা ভীষণ রাগী। মাঝে মধ্যে হয়তো মায়ের কুকথা শুনতে হতে পারে, তাতে তোমার আপত্তি নেইতো?
নীলয় নীলার প্রেমে এতোটাই ইমোশনাল, যে কোনো কিছু না ভেবেই বলে দেয় --
-- তোমার মা মানে আমার মা। মা যদি ছেলেকে দু'চার কথা শোনায়, তবে শোনাবে। আমি সেই কথায় কিছু মনে করবো না।
নীলা খুব খুশি। নীলা বলল --
-- তুমি কিন্ত আজকেই তোমার বাড়িতে আমাদের বিয়ের কথাটা বলবে।
-- হ্যাঁ, নীলা বলবো।
সেদিন বাড়ি ফিরেই নীলয়, মাকে সব কথা বলল। কিন্ত বাড়ির কেউ রাজি হলো না। তারা বারবার বলতে লাগল, ঘর জামাই থাকিস না নীলয়। ওই সম্পর্ক ভেঙে দে তুই। তোর ভালোর জন্য বলছি। নীলয় কারো কথা কানে তুললো না। পরদিন মন্দিরে নীলাকে বিয়ে করে, নীলার বাড়িতে উঠলো নীলয়। নীলার বাবা বিষয়টা মেনে নিলেও, ওর মা কিন্ত প্রথম দিনেই বুঝিয়ে দিতে চাইলো, তার কথা না শুনলে এই বাড়ি থেকে চলে যেতে হবে।
ওদের দুজনের মধুময় সম্পর্কটা বেশ চলতে লাগলো। মাঝে মধ্যে নীলার মা দু'চার কথা শোনায় ঠিকই, তবে নীলয় এক কানে ঢোকায়, আর এক কানে বের করে দেয়।
বছর যত গড়ালো, ততই যেন বাড়ির চাকরের মতো ব্যবহার পেতে লাগলো নীলয়। বাড়ির সব কাজ একার হাতে করতে লাগলো। সে চাকরী পায় নাই। তাই মুখ বুঝে সব কাজ করে যেতে লাগলো। খেতে দেওয়ার আগেও তাকে নানা রকম ভাবে অপমান করতো শাশুড়ি। নীলয়ের শ্বশুর সব কিছু দেখে একদিন নীলয়কে বলল -
-- বাবা, ওদের কথায় কিছু মনে করো না। আমিও চল্লিশ বছর ধরে এমন অপমান সহ্য করে আসছি।
-- না বাবা, আমি ওদের কথায় কিছু মনে করি নাই। শুধু যদি একটু ভালবাসা পেতাম তাহলে বোধহয়.....
নীলয় রাতে লুকিয়ে কাঁদতো। মনে পড়তো, বাড়ির সকলে বারণ করা সত্ত্বেও তাদের কথা শোনে নাই। বাবা মা'র কথা না শুনে, নীলাকে ভালোবেসে বাড়ি থেকে বের হয়ে এসেছে। নীলয় শুধু ভালোবাসার টানে নিজের পরিবার ছেড়েছে। এখন সে কোন মুখ নিয়ে বাড়ি ফিরবে?
নীলয় সব মুখ বুজে সহ্য করে যাচ্ছিল, কিন্ত সেদিন নীলা একটা ছেলেকে বাড়িতে নিয়ে এলো। নীলয়কে বলল---
-- নীলয়, এর নাম সুমন, আমার খুব ভাল বন্ধু। শোনো, আমি সুমনকে নিয়ে ঘরের ভিতরে যাচ্ছি, তুমি এক বোতল জল আর, দুটো গ্লাস নিয়ে এসো।
-- এসব দিয়ে কি হবে নীলা?
-- সেটা তোমার জানার প্রয়োজন নেই নীলয়, তোমাকে যা হুকুম করলাম সেটা তাড়াতাড়ি করো। আর যদি না করো, তাহলে এই বাড়ি থেকে বের হয়ে যাও। আর কোনোদিন তোমার মুখ যেনো দেখতে না পাই।
নীলার বন্ধু সুমন বলল--
-- এটা কে নীলা? তোমার মুখের উপর কথা বলে?
-- ও এই বাড়ির চাকর।
নীলয় নীলার কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল। নীলা তাকে চাকর বলল, এটা সে যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলো না।
সুমন বলল--
-- এই ইউ,-- মালকিনের মুখের উপর কথা বলার সাহস হয় কি করে তোমার? জুতিয়ে মুখ ভেঙে দেবো।
নীলা বলল --
-- ছাড়ো সুমন ছোটলোকটার কথা, চলো ভিতরে চলো।
নীলয় দু'চোখে শ্রাবণের ধারা। তার মন ''কু' গাইতে শুরু করলো। সে বুঝতে পারলো, তার ভালোবাসাকে নীলা পায়ে মাড়িয়ে দিয়েছে। যার জন্য সে তার ঘর ছেড়েছে, সেই নীলা তার থেকে দূরে সরে গেছে। সে মনে মনে ঠিক করলো নীলাকে যেভাবেই হোক খারাপ কাজ থেকে রুখতে হবে। তাই সে নজর রাখার জন্য কাঁচের গ্লাস, আর এক বোতল জল নিয়ে ওদের রুমে প্রবেশ করলো। সেখানে নীলয় দেখলো, দুজনে গা ঘেঁষে বিছানায় বসে আছে। টেবিলের সামনে একটা মদের বোতল নামানো। নীলয় সাথে সাথে প্রতিবাদ জানিয়ে বলল--
-- তুমি মদ খেয়ো না নীলা, আমার খারাপ লাগবে।
-- আমি মদ খাবো কি খাবো না, তাতে তোমার কি? আমার বাড়ি, আমি যা ইচ্ছা করবো।
সুমন বলল-
-- ইউ বাস্টারড, যত বড় মুখ নয় তত বড়ো কথা, মালকিনের মুখের উপর কথা।
সুমন নীলয়ের গালে চড় মারতে উদ্যত হলে, ওর হাতটা ধরে ফেলে, নীলয় ওকে ঠিলে দেয়।
-- তোর এতবড়ো সাহস আমার গায়ে হাত দিলি?
সুমন ওর জামার কলার চেপে এলোপাথাড়ি ঘুষি চালায়। সুমন হাঁপিয়ে উঠলে নীলা ওর জুতো খুলে নীলয়ের মুখে মারে।
নীলয় এটার জন্য প্রস্তুত ছিলো না। চুপচাপ মাথা নামিয়ে বাড়ি থেকে বের এসে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে থাকে। জীবনের চরমতম শিক্ষা সে পেয়েছে।
আর কখনো নীলার কাছে ফিরবে না। নীলয় দেখতে পায় সামনে গোধূলি বেলার আলো কমে আসছে। সাঁঝ নামছে দ্রুত। নীলয় পাগলের মতো হেঁটে চলেছে রাস্তার মধ্যিখান দিয়ে --
কিছুক্ষণ পর বাজারে একটা একটা হৈ-চৈ শোনা গেলো। একটা পাগল গাড়ি চাপা পড়েছে, স্পট ডেড। কেউ বলতে লাগলো-
-- আহা,, বেচারা, খুব ভালো, শান্ত শিষ্ট নিরীহ মানুষ ছিলো। নীলয় রোজ যে কুকুরগুলোকে খেতে দিতো, তারা নীলয়কে ঘিরে উচ্চস্বরে কাঁদতে লাগলো। আপনজন বোধহয় তারাই ছিলো।
No comments yet.