গল্প: ঘন্টা দাদু
রেটিং: 0.0 ★ | লাইক: 0 | পাঠসংখ্যা: 128
পাঁচটা ক্লাসরুম, একটা ছোট লাইব্রেরি, আর একটি খালি মাঠ—যেখানে প্রতিদিন সকালে জাতীয় সংগীত হয়, দুপুরে দৌড়, বিকেলে বিদায়।
আর এই সব কিছুর মাঝখানে ছিলেন একজন—বিষ্ণুদাদু।
সবাই ডাকত, ঘন্টা দাদু।
তিনি ছিলেন স্কুলের দারোয়ান। কিন্তু সেই পরিচয়টা কেবল বাইরে থেকে।
ভিতরে তিনি ছিলেন সেই মানুষ, যিনি প্রতিদিন সবচেয়ে আগে স্কুলে আসতেন, আর সবার শেষে যেতেন।
বিষ্ণুদাদুর হাতে থাকত একটা বড় পিতলের ঘণ্টা। তিনি তা বাজাতেন বেশ কয়েকবার বার—সকাল, রিক্রিয়েশন, প্রতিটি পিরিয়ডের শেষে আর ছুটির সময়।
কিন্তু তাঁর আসল “ঘণ্টা” ছিল অন্য জায়গায়।
বেলা ১১টায় যে বাচ্চা টিফিন ভুলে যেতো, তিনি নিজের হাতে ভিজে মুড়ি আর নারকোল কুচি দিতেন।
যে বাচ্চা পায়খানা করতে গিয়ে জামা নোংরা করে ফেলত, দাদু নিজে নিয়ে যেতেন, ধুয়ে দিতেন—কোনো অভিযোগ নেই, কোনো বিরক্তি নেই।
একবার পঞ্চম শ্রেণির একটি ছেলে—সুব্রত—পরীক্ষার খাতায় ফেল করে ভেঙে পড়েছিল। শিক্ষক কড়া কথা বলেছিলেন।
ঘন্টা দাদু তখন তাকে এক কোণে নিয়ে বলেছিলেন—
“বাবা, একটা খাতা মানুষকে বিচার করতে পারে, কিন্তু একটা মন পারে না। মনটা ঠিক রাখিস, খাতা একদিন ঠিক হয়ে যাবে।”
সুব্রত তখন বুঝে ওঠেনি, কিন্তু পরে সেই কথাটা জীবনের দিশা হয়ে উঠেছিল।
সেই বছর একটা হেমন্তের দিন।
দাদু হঠাৎ স্কুলে আসা বন্ধ করলেন।
প্রথমে সবাই ভাবল, হয়তো ছুটি নিয়েছেন।
তারপর জানা গেল, দাদু আর নেই। রাতে ঘুমের মধ্যে চলে গেছেন।
স্কুলের মাঠে একটা চেয়ার রেখে তার উপর রাখা হয়েছিল সেই পিতলের ঘণ্টা।
শিশুদের কেউ বুঝে উঠতে পারেনি, কেন মন খারাপ, কেন মাঠটা এমন নিঃশব্দ।
বেশ কিছু বছর পরে, সুব্রত তখন একজন নামকরা চিকিৎসক।
নিজের ছেলেকে ভর্তি করতে এসেছেন শহরের বড় এক স্কুলে।
ছেলে জিজ্ঞেস করে,
—“তোমার স্কুলে কি প্রিয় স্যার ছিল?”
সুব্রত বলেন না কিছু। শুধু বলেন—
—“আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ ছিলেন ঘন্টা বাজানো এক বৃদ্ধ, যিনি আমায় শিখিয়েছিলেন—মন মানুষ চেনে, খাতা নয়।”
শেষ কথা -
এই গল্পটি নিছক স্মৃতিমেদুর নয়, এটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়—স্কুলজীবনে একজন দারোয়ান বা পরিচ্ছন্নতাকর্মী কিভাবে হয়ে ওঠে আত্মার আপনজন। আপনার আছে এমন কোন স্মৃতি ?
No comments yet.