হরবোলা - পারিবারিক গল্প | বাংলা গল্প

হরবোলা

রেটিং: 0.0 ★ | লাইক: 3 | পাঠসংখ্যা: 308

হরবোলা বিজয় চৌধুরীকে কে না চেনে, গ্রামের প্রতিটা মানুষ তাকে ভীষণ ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে।বিজয় ও সেই দিক থেকে কসুর করেন না, তাঁরও গ্রামের আবালবৃদ্ধবনিতা সকলের সঙ্গে নিবিড় বন্ধুত্ব।গ্রামের মানুষের বিপদে-আপদে নিজের থেকেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। জমিদার পরিবারের সম্তান হয়েও বিজয়ের মধ্যে কোনো বিলাসিতা বা *অহংবোধ* নেই ,সাদামাটা জীবন-যাপন করেন । এমন নির্ভীক, পরোপকারী, নির্বিবাদী মানুষ, তিনি অজাতশত্রু, তাঁর কোনো শত্রু নেই সবাই শুধু তাঁর মিত্র। মাঠে ঘাটে বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানোই তাঁর নেশা। জঙ্গলের পশুপাখিরা তাঁকে দেখলে খুশিতে নানান সুরে ডেকে ওঠে, বিজয় ও তাঁর সহজাত সুরে ওদের আকৃষ্ট করেন। আর *কত* পাখি, কাঠবিড়ালি বিজয়ের দেওয়া বাদাম,ছোলা, বিভিন্ন শস্য দানা খেতে আসে,ওরা বিজয়ের মাথায় , হাতে এসে বসে, আদর করে ।ওই সব পশুপাখিরাও বোঝে বিজয় ওদের কোনো ক্ষতি করবে না, *বিজয় ওদেরই বন্ধু*। গ্রামেরই এক প্রাইমারী স্কুলে শিক্ষকতা করেন তিনি, আর সময় সুযোগ পেলেই বেড়িয়ে পরেন প্রকৃতির টানে প্রকৃতির মাঝে। বিজয়ের ঠাকুরদা ছিলেন একসময়ের দোর্দণ্ড প্রতাপ জমিদার, রাজনারায়ণ চৌধুরী। তাঁর অগাধ বিষয় সম্পত্তি আর অনেক গুলো ব্যাবসা। জমিদার রাজনারায়ণ চৌধুরীর দুই পুত্র প্রতাপ চৌধুরী ও প্রদীপ চৌধুরী এবং একমাত্র কন্যা কমলিনী । বড়ো ছেলে প্রতাপ চৌধুরী ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে, বিদেশি কোম্পানিতে মোটা মাইনের চাকরি নিয়ে স্থায়ীভাবে বিদেশে চলে গিয়েছেন, দেশে ফেরার ইচ্ছেও তাঁর নেই । বিজয়ের বাবা প্রদীপ চৌধুরী ছিলেন রাজনারায়ণ চৌধুরী ছোটো ছেলে , একজন নামকরা উকিল। তাঁর ও আর্থিক অবস্থা নেহাৎ কম ছিল না । বিজয়রা দুই ভাই এক বোন। দাদা রাজেশ বিলেত থেকে ডাক্তারি পাশ করে দেশে ফিরে,শহরের এক নামী হাসপাতালে ডাক্তারি করেন , তিনি ও তাঁর পরিবার শহরেই থাকেন। দিদি সুপর্ণার বিয়ে হয় দাদা রাজেশের এক ডাক্তার বন্ধু শুভ্রাংশু চক্রবর্তীর সঙ্গে। বিয়ের পর সুপর্ণা স্বামী শুভ্রাংশুর সঙ্গে লন্ডনে চলে যান পাকাপাকি ভাবে । বিজয় ছোটো বেলার থেকেই গ্রামের বাড়িতে প্রকৃতির মাঝে কাটিয়েছেন , বনে জঙ্গলে গাছগাছালি, পশুপাখির সঙ্গে তার সখ্যতা গড়ে উঠেছে স্বাভাবিক ভাবেই। বনে জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে তাঁর সহজাত ভঙ্গিতে পশুপাখির ডাক হুবহু নকল করতে পারেন তিনি, এই কারণে বিজয়কে হরবোলা নামেই চেনে সবাই। বিজয় বিদেশে পড়াশোনা করতে গিয়েও, কিছুদিন পর সব ছেড়েছুড়ে ফিরে এসেছিলেন প্রকৃতির টানে। বিজয়দের গ্রামের শেষ প্রান্তে জঙ্গলে ঢোকার মুখে একটা জরাজীর্ণ মা বনবিবির মন্দির আছে সেখানেই প্রকৃতি প্রেমী বিজয়ও তাঁর বন্ধুদের আস্তানা। ছোটো বেলা থেকে বিজয় বিধবা পিসি কমলিনীর কাছেই মানুষ হয়েছেন। কোচবিহারের একসময়ের জমিদার সত্যপ্রসন্ন ঠাকুরের দ্বিতীয় পুত্র সুকল্যান ঠাকুরের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন কমলিনী । কিন্তু নিষ্ঠুর বিধাতার রোষানলে, স্বামী হারা হয়ে পিতৃগৃহে ফিরে আসতে হয়। পিতৃগৃহে ফিরে দিশাহারা কমলিনী, মা হারা ছোট্টো বিজয় ও তার দুই ভাই বোনকে আঁকড়ে ধরেছিলেন, তাদের সন্তান স্নেহে আদর যত্নে মানুষ করেছেন তিনি । বিজয়ও পিসি কমলিনীকে মায়ের মতোই ভালোবাসেন, আগলে রাখেন সব সময় । একসময় কমলিনী, চৌধুরী বাড়ির গৃহকর্ত্রী হয়ে ওঠেন। কমলিনীর নির্দেশ ছাড়া অন্দরমহলের কোনো কাজই সম্পন্ন হয়না। বিজয় হলো কমলিনীর নয়নের মণি । বিজয়ের এই প্রকৃতি প্রেম ও বাউণ্ডুলেপনা ঘোচানোর জন্য, কমলিনী বিজয়ের বিবাহের *ব্যবস্থা* করেন। ঘটক সন্ধান আনে, হরিপালের সম্পন্ন পরিবারের শিক্ষিতা ও সুন্দরী পাত্রীর। পিতা রাজীব রঞ্জন সেন একজন হাইস্কুলের ইংরেজির শিক্ষক। প্রথম দিকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বিজয়কে পছন্দ ছিল না পাত্রী পক্ষের ,কিন্তু যখন জানতে পারলেন বিজয় চৌধুরী অগাধ পৈতৃক সম্পত্তি ও কয়েকটি ব্যাবসার মালিক,তখনই বিবাহে সম্মত হয় পাত্রীপক্ষ । বিজয় ও বিয়ের জন্য রাজি ছিলেন না, তাঁর মনে হয়েছিল তাঁর মতো বাউণ্ডুলে, ছন্নছাড়া মানুষের সাথে কোনো মেয়েই সংসার করতে পারবে না। কিন্তু পিসি কমলিনীর আদেশ উপেক্ষা করতে পারলেন না। অবশেষে বিবাহে রাজি হয়ে যান। দুই পরিবারের আলাপচারিতায় ও আলোচনায় বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক হয়ে যায়। নির্দিষ্টক্ষণে শুভ দিনে খুব ধুমধাম করে বিজয় ও গীতশ্রীর বিবাহ সম্পন্ন হয়ে যায়। প্রথম প্রথম গীতশ্রী বিজয়কে খুব শ্রদ্ধা, ভালোবাসাও আদর-যত্ন করতো। বিজয় ও গীতশ্রী কে পেয়ে ভীষণ খুশি ছিলেন। কিন্তু কিছু দিন যাওয়ার পর বিজয়ের সহজ সরল মনোভাব, মাঝে মাঝে প্রকৃতির টানে বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া ও গ্রামের গরীব মানুষদের সাথে আন্তরিক ভাবে মেলামেশাটা গীতশ্রীর একদম পছন্দ নয় । এছাড়াও বিজয়ের খাম-খেয়ালিপনা , পশুপাখি, গাছগাছালির প্রতি অগাধ ভালোবাসা এই সব ব্যাপার নিয়ে আপত্তি তার, বড়োলোকের নাকউঁচু , বদমেজাজী, অহংকারী মেয়ে গীতশ্রী। মনে মনে গীতশ্রী বিজয়কে একেবারে সহ্য করতে পারতো না। কিন্তু বিজয়ের অগাধ *ধন* সম্পত্তির লোভে বশবর্তী হয়ে, সবকিছু মেনে নেওয়ার চেষ্টা করতো গীতশ্রী। এই ভাবে বেশ কয়েক বছর ভালো মন্দ মিশিয়ে কেটে যায়।তাদের দুটি যমজ সন্তান হয় একটি পুত্র ও একটি কন্যা, পিসি কমলিনী ওদের পেয়ে ভীষণ খুশি। ওদের যত্ন আত্তির, লালন-পালনে তাঁর সারাদিন কেটে যায়।
এরপর একদিন বিজয়ের দিদি সুপর্ণা তার দুই পুত্র এবং কয়েক জন আত্মীয় বিজয়দের বাড়িতে বেড়াতে আসে সুদুর লন্ডন থেকে। তাদেরই একজন পেশায় ফটোগ্রাফার রুস্তম খাসনবিশ , শিক্ষিতা, সুন্দরী তন্বী গীতশ্রীকে খুব ভালো লেগে যায়। রুস্তম নানা অছিলায় গীতশ্রীর কাছে চলে আসে। নানান পোজে সুন্দর সুন্দর ছবি তুলে দেওয়ার অজুহাতে গীতশ্রীর আরো কাছে চলে আসে। কয়েক দিনের আলাপেই দুজন দুজনের প্রেমে পরে যায়। অর্থলোভী গীতশ্রীর বুদ্ধিতে চলতে থাকে রুস্তম , দু'জনে উপায় খুঁজতে থাকে বিজয়কে ঠকিয়ে কিভাবে তাঁর সব সম্পত্তি হাতানো যায়। , সবই চলতে থাকে লোকচক্ষুর আড়ালে। বিজয় বা তার পিসি কমলিনী ঘুনাক্ষরেও টের পায়না। কিছু দিন কাটিয়ে সবাই একসময় ফিরে যায় লন্ডনে। কিন্তু রুস্তম গ্রামের কিছু দৃশ্য ফটোশুট করবে বলে ওই বাড়িতে থেকে যায় আরো কিছু দিন । রুস্তম ও গীতশ্রী ফন্দি আঁটতে থাকে কিভাবে বিজয় চৌধুরী কে তাদের রাস্তা থেকে সরিয়ে ফেলা যায়। অবশেষে বিজয়ের পাড়ারই এক বন্ধুর বিয়ের নিমন্ত্রণ আসে বিজয়দের বাড়িতে। বিজয়ের বাড়ির সবাই যেন উপস্থিত থাকে।পিসি কমলিনী যেহেতু বিধবা, তিনি নিরামিষ খাবার খেতেন, তাও নিজে রান্না করে, অন্য কারোর হাতের রান্না তিনি খান না । *অতএব* তাঁর বিয়ে বাড়ি যাওয়ার *প্রশ্নই* ওঠেনা। বিজয়ের স্কুলের একটা কাজ থাকায় ওইদিন তিনি বরযাত্রী যেতে পারবেন না আগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন বিজয়। ঠিক হয় বাচ্চাদের নিয়ে শুধু গীতশ্রী যাবে বরযাত্রী। ব্যাস ওটাকেই তুরুপের তাস করে বিজয়কে পৃথিবী থেকে চিরজীবনের মতো সরিয়ে ফেলার ছক সাজিয়ে ফেলে রুস্তম ও গীতশ্রী। ঠিক হয় রুস্তম আগের দিন বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে, এবং শহরের অন্যত্র আস্তানা গেড়ে থাকবে , সবাই কে বলে যাবে লন্ডনে ফিরে যাচ্ছে। আর গীতশ্রী বিজয়ের খাবার আগের দিন রান্না করে ফ্রিজে রেখে যাবে। গীতশ্রী খাবারের সাথে বিষ মিশিয়ে ফ্রিজে রেখে গিয়েছিল বরযাত্রী যাওয়ার আগে। সহজ সরল বিজয় কিছু টের ও পায়নি। প্ল্যান মাফিক কাজ করে গীতশ্রী সুন্দর করে সেজেগুজে সন্তানদের নিয়ে বরযাত্রী রওনা হয়ে যায়। এদিকে বিজয় এই বিষ মেশানো খাবার নিজে খায় আর পোষা বিড়ালকেও খাওয়ায়। খাবার খেয়ে স্কুলে পৌঁছে বিজয় অসুস্থ বোধ করে, স্কুল কর্তৃপক্ষ সেদিন বিজয়কে হসপিটালে ভর্তি করে দিয়েছিলেন কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। কতোগুলো অর্থলোভী মানুষের লোভ লালসার শিকার হয়ে অকালে চিরতরে ইহকালের মায়া ত্যাগ করে চলে যেতে হয়েছিল নিরপরাধ নির্লিপ্ত বিজয় চৌধুরী কে।আর তাঁর পোয্য বিড়ালের ও একি পরিনতি হয়েছিল সেই বিষের অভিঘাতে।

Comments

Please login to post a comment.

No comments yet.

সাম্প্রতিক গল্প

অমৃতফুলের সন্ধান

অমৃতফুলের সন্ধান

By apuguin in রূপকথার গল্প

(0.0) ❤️ 0 👁️ 315
অদৃশ্য লাইব্রেরি

অদৃশ্য লাইব্রেরি

By apuguin in জীবনমুখী গল্প

(0.0) ❤️ 0 👁️ 53
হ্যারিকেনের আলো

হ্যারিকেনের আলো

By apuguin in হৃদয়স্পর্শী গল্প

(0.0) ❤️ 0 👁️ 86