জীবনযুদ্ধে হেরে গিয়ে, এই পৃথিবী ছেড়ে পালিয়ে যাবার পথ খুঁজছিল আরশি। জীবনের প্রতি অনীহায় মৃত্যুকে বরণ করে নিতে বার বার মৃত্যুর দেবতার স্মরনাপন্ন হয়েছে সে কিন্তু তাঁর দেখা পায়নি কখনো। একসময় নিজেই পরপারের রাস্তা খুঁজতে গিয়ে আরশি একটা খাদের কিনারে এসে দাঁড়ায়। আর একটা পা এগোলেই চিরকালের জন্য গভীর অতলে তলিয়ে যাবে সে। মনে মনে তারই প্রস্তুতি নিয়েছে বহু দিন ধরে। অনেক অভিমান জমে রয়েছে এই পৃথিবীর মানুষের প্রতি ,তাই তো সবমায়া ত্যাগ করে চিরতরে বিদায় নিতে চায়। পা উঠিয়ে সবে শেষ পদক্ষেপ ফেলতে যাবে, তখনই গভীর অতলে আরশি, তার নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পায়। প্রতিবিম্বটা যেন ওর দিকে তাছিল্যের দৃষ্টিতে তাকিয়ে খিলখিল করে হাসছে।ঠিক সেই সময় বিশালাকার দৈত্যের মতো দর্শনধারী একজন ব্যাক্তি আবির্ভূত হলেন, আরশির সামনে। তাঁকে দেখে ভীষণ ভয় পেয়ে আঁতকে উঠল সে। সেই অদ্ভুত দর্শনধারী ব্যক্তি আরশিকে আশ্বস্ত করে , নিজের পরিচয় দেন যে, তিনিই পরপারের এক এবং একমাত্র শাসক স্বয়ং যমরাজ।এতোদিন আরশি যাঁকে বারংবার স্মরণ করেছে। তিনি এসেছেন পরপারে আরশিকে স্বাদরে অভ্যর্থনা করে নিয়ে যাবার জন্য । সঙ্গে শীর্ণকায় চেহারার হিসাব রক্ষক বৃদ্ধ চিত্রগুপ্ত। আর ষণ্ডামার্কা চেহারার দশ-বারো জন ব্যাক্তি। ওই ষণ্ডামার্কা চেহারার ব্যাক্তিদের মাথায় বিশাল আকৃতির মোটা একটা খাতা। এতো বড়ো খাতা আরশি জীবনে ও দেখেনি। আবাক হয়ে খাতার দিকে তাকাতেই বৃদ্ধ চিত্রগুপ্ত ক্ষীণক্ষীণে কণ্ঠে আরশিকে জানায়, এই খাতাতেই এই মর্ত্যলোকের সমস্ত মানুষের ও অন্যান্য প্রাণীদের জীবনের জমা-খরচের হিসাব আছে। মর্ত্যে জনসংখ্যা যে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে , তার ফলে খাতাটার পরিধি ক্রমশঃ বেড়েই চলেছে। তবে চিত্রগুপ্তের মতে, মর্ত্যলোকে দিন দিন যে হারে, অপরাধ প্রবণতা, ফন্দিবাজী, মানুষ ঠকানো, খুন ও রাহাজানির বাড়বাড়ন্ত তাতে খুব শীঘ্রই এই পৃথিবী রসাতলে যাবে। আর তাতেই তাঁর স্বস্তি। যাক সে কথা, ক্ষীণক্ষীণে কন্ঠে চিত্রগুপ্ত আরশিকে জিজ্ঞেস করে, জীবন থেকে যখন পালিয়ে যাচ্ছ, কোথায় যেতে চাও তুমি? সেখানে যাওয়ার আগে তোমার মর্ত্যলোকে জীবনের জমা-খরচের হিসাবটা আগে দাও। কি কি দিলে আর কি কি পেলে? কতোটা ভালো কাজ করেছো আর কতোটা মন্দ কাজ করেছো তার হিসাব মেলাটাও খুব জরুরি। এই মর্ত্যে খালি হাতেই তোমাকে পাঠানো হয়েছিল আর ফেরার সময়ও তোমায় খালি হাতেই ফিরতে হবে , সেটা জানা আছে তো?এই মর্ত্যে কিছু বিশেষ ও মহৎ কাজ করার উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়েছিল তোমাকে , সেই কাজগুলো সঠিক ভাবে পালন করেছো কি না সেই জমা-খরচটাই আগে দিতে হবে, সেটা মিললে তবেই তুমি পরপারে যাওয়ার ছাড়পত্র পাবে। তারপর তোমার কাজের খতিয়ান বুঝে পরপারের কোন ক্যাটাগরিতে তুমি জায়গা পাবে সেটাও দেখার বিষয়। আরশি অবাক হয়ে চিত্রগুপ্ত কে জিজ্ঞেস করলো পরপারের আবার বিভাগ বা ক্যাটাগরি আছে? সেটা কি রকম? চিত্রগুপ্ত আরশিকে বলে, চলো তাহলে নিজের চোখেই একবার দেখে আসবে? আরুশি কে নিয়ে যমদূত ও চিত্রগুপ্ত প্রথমে গেল নরকে সেখানে প্রচুর অদ্ভুত দর্শন ধারী মানুষ, কেউ নর্দমা পরিস্কার করছে, কেউ বাগান পরিস্কার করছে, কেউ কেউ ঝাঁটা নিয়ে সাফসাফাই করছে। একটা কলনিতে সবাই মিলে দলবদ্ধ ভাবে বাসকরে। স্বর্গ ও অন্যান্য পর্যায়ে বসবাসকারীদের উচ্ছিষ্ট খাবার গুলোই তারা খেতে পায়। দ্বিতীয় পর্যায়ের বাসিন্দার সংখ্যা নরকের তুলণায় কম, এরা বিভিন্ন শাক-সবজি, শস্য দানাও অন্যান্য ফসল উৎপাদন করে। এই সব চাষিরাও একসঙ্গে একটা কলোনিতে বসবাস করে। তৃতীয় পর্যায়ে বসবাসকারী হলো শিক্ষিত প্রতিনিধির দল, এরা সবাইকে বিভিন্ন শিক্ষা দান করেন, যেমন পড়াশোনা শেখানো, নাচ- গান শেখানো ও বিভিন্ন শিক্ষামূলক কর্মসূচি পালন করেন এঁরা । চতুর্থ পর্যায়ের বাসিন্দারা বড়ো বড়ো ব্যাবসায়ী, বেশ আয়েশি ভঙ্গিতে জীবনধারণ করে। নরকের ও অন্যান্য পর্যায়ের বাসিন্দারা এদের ফাইফরমাশ খাটে, কেউ গা হাত-পা টিপে দিচ্ছে, কেউ রান্না করে দিচ্ছে, কেউ খাবার পরিবেশন করছে। কেউ স্নানের ব্যবস্থা করে দিচ্ছে এলাহি ব্যাবস্থা এঁদের জন্য । আর পঞ্চম পর্যায়ে দেব-দেবী গণ, এবং তাঁদের সেবাদাসীরা বসবাস করেন। সেখানে সুখ সাচ্ছন্দ্যে* পরিপূর্ণ। এবার যমরাজ বললেন, এই সব পর্যায়ের বাসিন্দারা নিজেদের ইচ্ছে মতো কোনো কাজ করতে পারেন না, কেউ স্বাধীন নন, সবাইকে আমার আদেশ অনুযায়ী চলতে হয়, আদেশ অমান্য করলে কঠিন শাস্তি দেওয়া হয়। সবাইকে দলবদ্ধ ভাবে বসবাস করতে হবে। কেউ নিজের জন্য আলাদা ঘর পাবেন না। খাওয়াদাওয়া করা, স্নান করা শোয়া একই সময়ে করতে হবে এর অন্যথা হলেই শাস্তি পেতে হবে। আর ভোর বেলায় ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে খাওয়ার ও স্নানের সময় বাদে কোনো রকম বিশ্রাম করা চলবে না। সব সময় যার যা কাজ তা করে যেতে হবে। ফাঁকি দিলেই তার আলাদা শাস্তি। বার বার শাস্তির উল্লেখ করছে শুনে আরশি ভয়ে ভয়ে যমরাজকে জিজ্ঞেস করে বসে এদেরকে কি ধরনের শাস্তি দেওয়া হয় প্রভু? যমরাজ আরশি কে শাস্তির জায়গায় নিয়ে গেলেন।সেখানে গরম তেলে কাউকে ভাজা হচ্ছে, কাউকে শূলে চড়ানো হচ্ছে, কাউকে উল্টো করে ঝুলিয়ে আড়ং-ধোলাই দেওয়া হচ্ছে আবার কাউকে গুয়ের পুকুরে ফেলে দিয়েছে,সেখানে হাবুডুবু খাচ্ছে । আরো কতো শত ভয়ংকর শাস্তির ব্যবস্থা যে আছে, আরশি সে সব দেখে তাজ্জব হয়ে যায়। ভয়ে আরশির গলা শুকিয়ে যায়, দমবন্ধ হয়ে আসে যমরাজ অভয় দিলেন, তোমার এখন এখানে কোনো ভয় নেই, তুমি নির্ভয়ে তোমার মত প্রকাশ করতে পারো। আরশি জল চাইলো সঙ্গে সঙ্গে জল নিয়ে হাজির হলো অপূর্ব এক সুন্দরী নারী। জল খেয়ে আরশি যমরাজকে বললো প্রভু এই পরপারের চারিদিক সুন্দর করে সাজানো, কোথাও এতোটুকুও নোংরা আবর্জনা নেই। মনোরম পরিবেশ। গাছে গাছে রঙবেরঙের ফুল ফুটেছে, নাম না জানা কতোরকম বাহারি ফল পেকে আছে গাছে গাছে, অপূর্ব দেখতে লাগছে। এছাড়াও কতো সুন্দর সুন্দর পাখি স্বাধীন ভাবে উড়ে বেড়াচ্ছে দেখতে অসাধারণ লাগছে পরিবেশটা । কিন্তু প্রভু এখানে বসবাসকারী মানুষের কোনো স্বাধীনতা নেই। মনে আনন্দ ও খুশি নেই , কোনো উচ্ছলতা নেই। তারা যেন প্রাণহীন কৃত্রিম জীব। আমাদের মর্ত্যে কিন্তু সবাই স্বাধীন ভাবেই জীবন-যাপন করে। কেউ কাউকে কোনো কিছুই চাপিয়ে দেয় না। হাসি আনন্দে ভরপুর । তারপরও সবাই কেন এই পরপারে আসতে চায়? যমরাজ হেসে বললেন তোমাদের রবি কবি কি বলেছিলেন মনে আছে? তিনি বলেছিলেন যে, "নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিশ্বাস, ওপারেতে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস। নদীর ওপার বসি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে; কহে, যাহা কিছু সুখ সকলি ওপারে। ”
আর তোমাদের মর্ত্যেবাসী সেটাই চিরন্তন সত্য বলেই মনে করে, আর সেই সুখ শান্তির আশায় এই পারে আসতে চায়। এটাই মানুষের ধর্ম। আরশি হাতজোড় করে যমরাজকে জানালো প্রভু , আমায় ক্ষমা করে দেবেন যতোদিন আমার জীবনের জমা-খরচের হিসাব না মেলে আমি মর্ত্যেই স্বাধীন ভাবে প্রকৃতি মায়ের কোলে বসবাস করতে চাই। যমরাজ বললেন 'তথাস্তু'। এমন সময় আরশির ঘুম ভেঙে যায়, আরশি এতক্ষণ স্বপ্ন দেখেছিল,সেইসঙ্গে তার জীবন দর্শন ও হয়ে গেল।
No comments yet.