লাল ডায়েরি
রেটিং: 0.0 ★ | লাইক: 0 | পাঠসংখ্যা: 116
—“যা ভাববি, যা অনুভব করবি, সব লিখে রাখবি। এই ডায়েরিটা হবে তোর নিজের একটা ছোট্ট জগৎ, যেখানে কেবল তুই আর তোর কথা।”
প্রথমে কিছুই বোঝেনি সে। অদ্ভুত অদ্ভুত কথা লিখত—আজ কী খেল, কোন বন্ধু কথা বলল, কোন শিক্ষক বকুনি দিল। কিন্তু ধীরে ধীরে ডায়েরিটা যেন তার মনের গোপন বন্ধু হয়ে উঠল। নিজের সব হাসি-কান্না, প্রথম প্রেমের কাঁপুনি, অভিমান—সব ওই পাতায় জায়গা পেত।
কলেজের দ্বিতীয় বছরে এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় বাবা চলে গেলেন চিরদিনের জন্য। পৃথিবী যেন হঠাৎ রঙ হারিয়ে ফেলল। মানুষের কাছে যা বলতে পারত না, যা কাউকে বোঝাতে পারত না—সব কথা ডায়েরির পাতায় ঢেলে দিত ঋতুপর্ণা। যেন সেই পাতাগুলো নীরবে তার চোখের জল শুষে নিত, তাকে আলতো করে সান্ত্বনা দিত।
বছর কেটে গেল। চাকরি পেল, নতুন শহরে গেল, অনেক নতুন মানুষের সাথে পরিচয় হল। তবুও সেই লাল ডায়েরি সবসময় ব্যাগের মধ্যে থাকত—একটা অদৃশ্য নিরাপত্তা বর্মের মতো। যখনই মন খারাপ হত, সে ডায়েরি খুলে বাবার দেওয়া প্রথম পাতার হাতের লেখা পড়ত। সেখানেই বাবা লিখে দিয়েছিলেন—
“যতদিন তুই লিখে যাবি, ততদিন আমি তোর কাছেই আছি।”
একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে বাসে বসে গল্প পড়ছিল সে। হঠাৎ ফোন বেজে উঠল, ব্যস্ত কথোপকথনে ডুবে গেল। কয়েক মিনিট পর যখন নামার জন্য দাঁড়াল, ব্যাগটা কোথাও নেই।
অগোছালো, ভিড়ভাট্টায় ছুটে বেরোল। বাস থামল, রাস্তায় খুঁজল, পুলিশ স্টেশনে গেল—কিন্তু লাল ডায়েরি আর পাওয়া গেল না। যেন বুকের ভেতর থেকে একটা অংশ হারিয়ে গেছে।
রাতের শহরের আলোঝলমলে জানালার পাশে বসে, সে হঠাৎ মনে করল—ডায়েরির শেষ পাতায় ঠিক কী লিখেছিল।
“যেদিন আমি এই ডায়েরি হারাব, সেদিন ধরে নেব বাবা আমার কাছে এসে বলছেন—এবার তুই নতুন পাতায় লিখ, নতুন জীবনে।”
ঋতুপর্ণার চোখ ভিজে গেল, কিন্তু অদ্ভুত এক শান্তি বুকের ভেতর নেমে এল। সে বুঝল—ভালোবাসা কখনো পাতায় বন্দি থাকে না। সেটা থেকে যায় মনে, প্রতিটি শ্বাসে, প্রতিটি সুরে, প্রতিটি শব্দে।
সেদিন রাতে নতুন একটা ডায়েরির প্রথম পাতায় সে লিখল—
“বাবা, আমি আবার লিখতে শুরু করলাম…”
No comments yet.