নিশি রাতের আর্তনাদ - ভৌতিক গল্প | বাংলা গল্প

নিশি রাতের আর্তনাদ

রেটিং: 5.0 ★ | লাইক: 3 | পাঠসংখ্যা: 142

দুম্! আ......................!
হঠাৎ একটা গুলির শব্দে ঘুম ভেঙে গেল গোটা জগৎপুরবাসীর।এমন মারাত্মক শব্দের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটা আর্তনাদ।বিকট,বীভৎস সেই আর্তনাদ।এই ঘটনা স্বাভাবিক এই গ্রামের মানুষের কাছে।এই গুলির শব্দ শোনার পরও যারা ঘুমিয়ে থাকে,তাদের মৃত্যু অবধারিত। কেন? কোথা থেকে আসে এই শব্দ?কি এর পিছনের ঘটনা?সেটা জানতে হলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে আজ থেকে ঠিক দুশো বছর আগে।-----
জগৎপুর গ্রামের শেষ সীমান্তে,ওই যে দূরে একটা ভাঙা বাড়ির ধ্বংসাবশেষ দেখা যায় দিগন্তের সঙ্গে মিশে আছে, জানো,ওটা কি?ওই বাড়ি এককালে ছিল জগৎপুরের রাজবাড়ী।পাশ দিয়ে বয়ে যায় গঙ্গা।প্রতি মাসের ২৩ তারিখ সেখান থেকে শোনা যায় সানাইয়ের সুর।এই সুরের সঙ্গে মধ্যরাতে ভেসে আসে বিয়ের কনের কান্নাভরা গলা,"বাবা,তুমি ওকে মেরে ফেলো না।আমি ওকে ভালবাসি।আমি ওকে ছাড়া বাঁচতে পারব না।তুমি চাওনা তো,তোমার মেয়ে সুখে থাকুক?"শোনা যায় এক বলশালী পুরুষ কন্ঠ,"শোনো রুক্মিণী,তুমি যদি ওকে বিয়ে করো,তবে তোমার আর আমার মধ্যে সমস্ত সম্পর্ক শেষ হয়ে যাবে।"শোনা যায় অট্টহাসি।"বাবা,তুমি এটা করতে পারো না।আমি দেবকে ভালবাসি।ওকে ছাড়া আমি বাঁচব না।"আবার শোনা গেল সেই কণ্ঠস্বর।"বেশ!তুই যখন ওকে ছাড়া বাঁচতেই পারবি না,তখন তো চোখের সামনেই ওর রক্ত ঝরবে।" "না বাবা ,তুমি এরকম কোরো না।আমার জীবনটা শেষ হয়ে যাবে।না বাবা, মেরো না ওকে।"কথার মধ্যেই শোনা যায় গুলির শব্দ,আর ওই আর্তনাদ।এবার শোনা যায় হাসির শব্দ, বাবার অট্টহাসি।মেয়ের কান্নাভরা গলার স্বর শোনা যায় সেই হাসির মধ্যে,"বেশ!তুমি যখন আমার কথা শুনলেই না,তখন আমিও আর বাঁচব না।তোমার সঙ্গে এই আমার শেষ দেখা ও কথা হওয়া,মনে রেখো।"শোনা যায় নূপুরের শব্দে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠা,শোনা যায় রুক্মিণীর বলিষ্ঠ কন্ঠ,"বাবা,আমায় তুমি ক্ষমা করে দিও।আজ,এই শুভদিনে,আমি আত্মহত্যা করলাম,বিষ খেয়ে।তুমিও জেনে রেখো বাবা,প্রতি মাসের ২৩ তারিখ আমি ও দেব দুজনেই ফিরে আসবো,আত্মা রূপে,আমাদের দুর্ভাগ্যময় জীবনের গল্প শুনবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।গোটা রাত জেগে শুনবে গ্রামের মানুষ এই গল্প।যারা শুনবে না বা ঘুমাবে,তারা রক্তশূন্য হয়ে মরবে,ঠিক তোমার মত বাবা।"বলতে বলতেই শোনা যায় বাবার কষ্টভরা কণ্ঠস্বর,যেন মুখ দিয়ে রক্ত উঠছে।এভাবেই অকালে শেষ হয়ে গেলো,একটা পরিবার!-------
পূজা আর রাহুল আজ খুব খুশি,কারণ ওরা যাবে নিখিলের বাড়ি।তার বাড়ি জগৎপুরে।ওরা ওকে ফানি বলে ডাকে।হঠাৎ দরজার ঠক ঠক শব্দে নিখিল গিয়ে দরজা খোলে।"আরে,পূজা আর রাহুল,আমি কি স্বপ্ন দেখছি নাকি?"বলে চেঁচাতে লেগেছে সে।পূজা বলে,"আরে ফানি,এত চেঁচাস নে রে,লোকে ভাববে পাগল।"নিখিল বলল,"আয়,ঘরে বোস,ভালো দিনেই এলি তোরা, তোদের কথাই হচ্ছিল।"রাহুল হঠাৎ ফস করে জিজ্ঞেস করে বসলো,"আচ্ছা,আজ কত তারিখ রে ফানি?"পূজা লক্ষ করল ফানির মুখটা শুকিয়ে যেন আমসত্ত্ব হয়ে গেলো।"কিরে,বল রে ভাই ,আজকে কত তারিখ?"তাড়া লাগলো রাহুল।"তা- তা- তারিখ নিয়ে কি করবি?"ফানি তুতলিয়ে বলে ফেললো কথাটা।"ও বাবা,তাও জানিস না?"পূজা চোখ পাকিয়ে বলল,"আরে সামনের হপ্তায় আমাদের পরীক্ষা আছে কলেজে,ভুলে গেলি নাকি?জলদি বল,আজ কত তারিখ।"রেগে বলল পূজা।
"আজ ২৩ শে জুন,রবিবার।"ফানি মুখটা শুকনো রেখেই বলল।"তো,তাতে হয়েছে কি?চাঁদবদনটাকে আমসত্ত্ব করে রেখেছিস কেন,ভালো করে বল না,"বলল পূজা। তখন ফানি পুরো ঘটনাটা বলল ওদের।রাহুল বলল, " চল্,আজ দেখেই আসি,কেমন ভূত ওটা।"ফানি বলল,"মায়ের দিব্যি,তোরা ওখানে যাস না।" "কেন রে,কি problem বলতো?একটা নতুন experience হবে ভূত দেখার,বল পূজা!"রাহুল বলল।ফানি বলছে,"না ,তোরা যাস না",ওরা বলছে,"আমরা যাবই।"এই তর্কের মাঝেই শোনা গেল একটা মেয়েলি কণ্ঠস্বর,"আমার মাংসের বাটিটা কবে দিবি রে?"ফানি হকচকিয়ে বলল,"মাংসের বাটি?তুই কে রে?"
এখন নিশ্চয় পাঠকবন্ধুরা ভাবছেন,এই মেয়েটা কে?হ্যাঁ,এই মেয়েটিই হলো উমা,রূপে লক্ষ্মী,গুণে সরস্বতী,কিন্তু ঝগড়ায় always first prize. গ্রামবাসীরা তটস্থ থাকে কখন নিখিল আর উমার মধ্যে ঝগড়া বাঁধবে।নিখিল মাংসের বাটিটা ফেরত দিতে ভুলে যাওয়ায় আবার ঝগড়া করতে চলে এসেছে উমা, আর এই ঝগড়ার মধ্যেই কবে যে ভালবাসার সৃষ্টি হয়েছে,ওরা নিজেরাই জানে না।
রাহুল কোনমতে ঝগড়া থামালো।তারপর ওরা ঠিক করলো ওরা চারজন একসাথে ওই রাজমহলে যাবে।যথারীতি রাতের বেলা ওরা রওনা হলো।হঠাৎ ওদের সঙ্গে দেখা হল দুজন অচেনা মেয়ের।ওদের দেখে মনে হলো ওরা খুব ভয় পেয়েছে।উত্তেজনার বশে ওরা তাদের পরিচয় জানতে চাইলো।ওরা ভয়ে ভয়ে বলল,"আমার নাম শ্রেয়া আর ওর নাম প্রিয়া।"ওরা চারজন জিজ্ঞাসা করল,"তোমরা এত রাতে একা একা কোথায় যাচ্ছ?"ওরা বললো,"আমাদের বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে,কিন্তু আমরা আরো পড়তে চাই,তাই আমরা পালিয়ে যাচ্ছি।" "কিন্তু আজ রাতে তোমরা কোথায় থাকবে?"পূজা জিজ্ঞেস করলো।"ওই যে ,রাজবাড়ীতে থাকবো।"বলল ওরা।রাহুল বলল,"আরে,আমরাও তো রাজবাড়ী যাচ্ছি।তোমরাও আমদের সঙ্গে চলো।"রাতের পরিবেশটা খুবই স্তব্ধ ,নিখিল জানে তার কারণ,তাও ওদের সঙ্গে যাচ্ছে। কোথা থেকে 'হুতুম - থুম' করে পেঁচা ডাকছে।দূরে শোনা যাচ্ছে শেয়ালের ডাক,' হুক্কাহুয়া।' খুব সন্তর্পনে তারা পৌঁছল রাজবাড়ী।হঠাৎ শুনতে পেলো পূজা বলছে,"আমার বাড়ি।আমাকে ঢুকতে দাও।"রাহুল বলল,"পূজা,কি বলছিস কি তুই?" "হ্যাঁ - হ্যাঁ ব- বল কি বলছিস?"থতমত খেয়ে বললো পূজা।"চল,ভেতরে ঢুকি,আমার তো excitement control ই হচ্ছে না রে।"বলল উমা।ওরা দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো।ভেতরে ঢুকে নিখিল ঘড়ি দেখল,রাত সাড়ে দশটা বাজে।এর মধ্যে হঠাৎ শোনা গেল, রাহুল বলছে,"রুক্মিণী,রুক্মিণী,
কোথায় তুমি? আমি তোমায় নিতে এসেছি,এসো তুমি।"পূজা বলল,"দেব,দেব!তুমি এসেছো?"আবার সেই ভারিক্কি গলা,উমা হতচকিত হয়ে দেখলো,এটা নিখিলের গলা,এর আগে এরকম গলা শোনেনি উমা ওর। ও বলছে,"দাঁড়াও রুক্মিণী,দেব;তোমায় আগে আমার মুখোমুখি হতে হবে।"উমা চেঁচিয়ে উঠল,"আরে তোদের হলোটা কি?এরকম করছিস কেন?"সে নিখিলের ঘোর ভাঙানোর জন্য ঠেললো,কিন্তু নিখিল ওকেই উল্টে ধাক্কিয়ে ফেলে দিয়ে বলল,"থামো সুরমা।"অমনি উমাও চেঁচিয়ে উঠলো,"তুমি শান্ত হও গো।"বোঝা গেল সবাই চলে গেছে দুশো বছর আগের ঘটনায়।
রুক্মিণী ওরফে পূজা আর দেব ওরফে রাহুল সূর্যকান্ত ওরফে নিখিলকে বোঝাতে চেষ্টা করলো।সুরমা ওরফে উমাও চেষ্টা করলো ওকে বোঝানোর।কিন্তু ভাগ্য আজ হয়তো ওই প্রেমিক প্রেমিকার সাথ দিল।সূর্যকান্ত বুঝল ,মেনে নিল ওদের কথা।খুব ধুমধাম,সবাই খুশি।একটা কথা পাঠকদের বলতে ভুলে গেছি,ওই যে প্রিয়া আর শ্রেয়া,ভাগ্যক্রমে ওরা ছিল ওই বাড়ির পরিচারিকা।সবারই মিল হয়ে গেলো,গিয়ে উঠল,"তুমি রবে নীরবে,হৃদয়ে মম।"কিন্তু মৃত্যু ওদের পিছন ছাড়ল না,এই শুভ মুহূর্তকেও মৃত্যু স্মরণীয় করে রাখতে দিল না।মিল হওয়ার পরমুহুর্তেই বাড়িটির ইট ভেঙে যেতে লাগলো, ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলো বাড়িটা,এক মুহূর্তে বাড়িসহ সকলে যেন মাটির সঙ্গে মিশে গেলো।বাড়িটার ধ্বংসস্তূপ থেকে আর কোনোদিনও কোনো শব্দ শুনতে পায়নি জগৎপুরবাসী। নিখিলদের বাড়ির রেডিওতে শোনা যাচ্ছে একটা পরিচিত রবীন্দ্রসংগীত,"আমার ভিতর বাহিরে, অন্তরে অন্তরে আছো তুমি হৃদয় জুড়ে........।

Comments

Please login to post a comment.

No comments yet.

সাম্প্রতিক গল্প

অমৃতফুলের সন্ধান

অমৃতফুলের সন্ধান

By apuguin in রূপকথার গল্প

(0.0) ❤️ 0 👁️ 315
অদৃশ্য লাইব্রেরি

অদৃশ্য লাইব্রেরি

By apuguin in জীবনমুখী গল্প

(0.0) ❤️ 0 👁️ 53
হ্যারিকেনের আলো

হ্যারিকেনের আলো

By apuguin in হৃদয়স্পর্শী গল্প

(0.0) ❤️ 0 👁️ 86