স্বপ্নাদেশ
রেটিং: 0.0 ★ | লাইক: 2 | পাঠসংখ্যা: 231
সামনে বিশাল ফটক দারোয়ান চব্বিশ ঘণ্টা পাহাড়ারত। দূরে বাইরে থেকে এতো বড়ো প্রাসাদ যে এখানে আছে বোঝা দুষ্কর। কারণ বিশাল বিশাল আম, কাঁঠালের গাছ বাড়িটাকে ঘিরে আছে।অনেক বছর আগের হলেও বাড়িটাতে আধুনিকতার ছোঁয়া জড়ানো। আর এমন দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে বানানো যে, যে কেউ দেখলে তাক লেগে যাবে । বাড়িটা মূলত তিনতলা কিন্তু গোটা একতলাটাই মাটির নীচে গুপ্ত কুঠুরির মতো করে বানানো। আর বাগানের একপাশে ঝোপের ভেতর ঢাকনা দেওয়া একটা পাতকুয়ো করা, ঢাকনা খুললে একটা সিঁড়ি নেমে গেছে নীচে, তার ভেতর দিয়ে একটা সুরঙ্গ পথ। সেই সুরঙ্গ পথ শেষ হয়েছে বেশ কয়েক মাইল দূরে নদীর ধারে জঙ্গলের ভেতর পাতা-লতা দিয়ে বানানো একটা পোড়ো বাড়ির মধ্যে ।
তখন কার জমিদার সত্যপ্রসন্ন রায় বর্মনের উত্তর সূরীরা এখন বাস করেন এই প্রাসাদে । শুনেছি ওই কমলদিঘিতে আগে প্রচুর পদ্ম ফুল হতো, এখন যদি ও লিজ দিয়ে শুধু মাছ চাষ করা হয়। চারদিকে চারটি শানবাধানো ঘাট, পাড়ার বহু পরিবার এখানে স্নান করা, কাপড় কাচা ও অন্যান্য কাজকর্ম করে থাকে। আগে গ্রামের মানুষজন এই দিঘির জলেই রান্না করা, এমনকি এই দিঘির জল পান করতো, তখন টিউবওয়েল ছিল না।
দিঘির পাশেই জমিদারদের পারিবারিক মন্দির। লোকমুখে প্রচলিত অপূর্ব সুন্দরী একদেবী সোনার প্রমোদ তরী নিয়ে পূর্ণিমা রাতে এই দিঘিতে ঘুরে বেড়ায়।অনেকেই তা প্রত্যক্ষ করেছে কিন্তু তারা কেউ বেশি দিন জীবিত থাকে নি, কেউ কেউ আবার অন্ধ হয়ে গেছে । সেই কারণে রাতের বেলায় কেউ ওই দিঘির আশেপাশে যায় না। আরো শোনা যায় ওই দিঘির নীচে একটা সোনার প্রাসাদ আছে, সেখানে অগাধ ধন-দৌলত মজুত করে রাখা আছে। আর সেখানেই দেবীর বাসস্থান। তিনি হলেন ধনসম্পদের দেবী। আরো জানা যায়, দেবী স্বপ্নাদেশ দিয়েছিলেন জমিদার সত্যপ্রসন্ন বাবুকে যে, এই দিঘি যেন কখনো সিচেফেলা না হয়, তাহলেই বিপদ।
এখনকার মালিক আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক সম্পন্ন ব্যাক্তি , তাঁর ও সব স্বপ্নাদেশের প্রতি বিন্দু মাত্র বিশ্বাস নেই। তিনি মনস্থির করেন দিঘিটা সিচে প্রচুর মাছ পাবেন, যা বিক্রি করে তিনি অনেক লাভবান হবেন, এ ছাড়া ও দিঘির নীচে অগাধ গুপ্তধন লুকানো আছে বলেই তাঁর ধারণা। সেই মতো দিঘিটা সেচের জন্য মোট আটখানা সেচ মেশিন বসিয়ে প্রায় পাঁচ দিন ধরে দিঘি টা সিচে ফেলেন। ভেবে ছিলেন প্রচুর মাছ পাবেন, সেই মতো অনেক জেলেও নিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু অবাক কান্ড, দিঘি সিচেফেলার পর একটা ও মাছ পাওয়া যায়নি। আর সিচেফেলার পর দিঘির পাশের গাছগাছালীতে কোনো ফুল-ফল এমনকি কোনো পশুপাখির দেখা ও মেলেনি। সবই যেন নিমেষে অন্তর্ধান হয়ে গেছে। মালিক সদাশিব বাবু বেশ মুষড়ে পড়েছিলেন প্রথমে তারপর ভাবলেন পাঁচ দিন ধরে যেহেতু দিঘিটা সেচা হয়েছে, তাই রাতের অন্ধকারে হয়তো কিছু মানুষ জন মাছগুলো চুরি করে ধরে নিয়ে চলে গেছে। নিজের মনকে এ ভাবেই স্বান্তনা দিলেন। এরপর তাঁর মনে হলো দিঘিটা খনন করে দেখা যাক, লোককথা অনুযায়ী গুপ্ত ধণের সন্ধান পাওয়া যায় কিনা না। গুপ্তধন পাওয়া আশায় প্রায় একশো জন শ্রমিক লাগালেন খনন কাজে।কিন্তু শুধু মাটি ছাড়া কিছু ই মেলেনি দিঘির নীচ থেকে। হতাশ হয়ে পরলেন সদাশিব বাবু।
কিছু দিন পর বর্ষার সিজন শুরু হলো, প্রথম বর্ষনে এক হাটু মতো জল জমা হয়েছে দিঘিতে। পাড়ার কচিকাঁচারা ওই হাটুজলেই সাঁতার কাটা ও হুড়োহুড়ি করতে শুরু করে । তাদের দেখে সদাশিব বাবুর একমাত্র ছেলে বছর নয়েকের নয়নাভ ও বায়না ধরে সেও ওই হাঁটুজলে সাঁতার কাটবে। মা নয়নিকা বার বার বারণ করে, ওই জলে নামলে গায়ে ইনফেকশন হতে পারে। কিন্তু নয়নাভ নাছোড়, বাধ্য হয়ে বাবা সদাশিব বাবু অনুমতি দিলেন। বললেন আধ ঘন্টার বেশি স্নান করা যাবে না। অনুমতি পেয়ে নয়নাভ দিঘির জলে নামলো পাড়ার বন্ধুদের সাথে সাঁতার কাটতে। বেশ খানিকক্ষণ সাঁতারে মশগুল হয়ে গেলো সবাই, জলও ঘোলা হয়ে গেছে ।
এবার বাড়ি ফেরার পালা সবাই যে যার বাড়ি ফিরে ও গেছে। হঠাৎ মা নয়নিকার খেয়াল পরলো ছেলে স্নান করে ফেরেনি। দিঘির কাছে গিয়ে দেখলো কেউ নেই। মা ভাবলো নিশ্চয় কোনো বন্ধুর সাথে তাদের বাড়িতে গেছে। বাবা সদাশিব কে সব জানালে পাড়ার সব বাড়িতে তন্নতন্ন করে খোঁজা হলো, নয়নাভ কারো বাড়িতে যায়নি।
অবাক হয়ে সবাই ভাবলো নয়নাভকে কেউ কিটন্যাপ করে নিয়ে যায়নি তো? পুলিশ স্টেশনে খবর দেওয়া হলো, পুলিশ সব বাচ্চাদের বয়ান শুনে , সন্দেহজনক কিছু পেল না। বিকেলের দিকে হঠাৎ একজনের চোখ আটকে গেল দিঘির জলে, ঘোলাটে জল কিছুটা স্বচ্ছ হয়েছে। তার মধ্যে ই বাবু হয়ে ধ্যানমগ্ন অবস্থায় বসে আছে নয়নাভ। তাড়াতাড়ি করে তাকে জল থেকে তোলা হলো। তখন তার শরীর স্ট্যাচুর মতো শক্ত, প্রাণহীন নিস্তেজ।
No comments yet.