সরকারি আবাসনের তিন তলায় মা বাবার সঙ্গে থাকে উর্মি। ভালো নাম উর্মিমালা ঘোষ, বাবা মণিময় ঘোষ একজন সরকারি কর্মচারী। উর্মি ছোটো থেকেই খুব শান্ত লাজুক প্রকৃতির , আবাসনের অন্যান্য বাচ্ছাদের সাথেই খেলাধুলা করেই তার বেড়ে ওঠা। ওই সরকারি আবাসনে বেশির ভাগই ডাক্তার পরিবারের বাস। শান্ত ও মিষ্টি স্বভাবের উর্মিকে ডাক্তার আঙ্কেল-আন্টিরাও খুব স্নেহ করেন। ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে তার পড়াশোনা।পড়াশোনার পাশাপাশি গান শেখা, ছবি আঁকা, আবৃত্তি করেও বেশ ভালই। হাতের কাজের নানান জিনিস বানাতো সংসারের ফেলে দেওয়া জিনিস দিয়ে । নিজের তৈরি করা সেই সব ওয়ালম্যাট, মুখোশ, ফুলদানি দিয়ে ঘরবাড়ি পরিপাটি করে সাজিয়ে রাখতে ভালোবাসে উর্মি। পড়াশোনা শেষ করে একটা হসপিটালে রিসেপশনিস্টের চাকরি পায় , ওই ডাক্তার আঙ্কেলদের সুপারিশে। মিশুকে স্বভাবের কারণে হসপিটালের অন্যান্য স্টাফদের সঙ্গে বন্ধুত্ব তৈরি হয় সহজেই। তার এই মিষ্টি স্বভাবের জন্য সবাই তাকে ভালোবাসে। একসময় হসপিটালের একজন তরুণ ডাক্তার রজত দস্তিদারের, উর্মিকে খুব ভালো লেগে যায়, উর্মিরও রজতকে ভালো লাগতো, কিন্তু তার লাজুক স্বভাবের কারণে কাউকে বুঝতে দেয়নি সে ।একদিন রজতই প্রথম উর্মিকে প্রেম নিবেদন করে, উর্মি একমুহূর্তও অপেক্ষা না করে, রজতের প্রস্তাবে রাজি হয়ে যায়। এরপর দুজন দুজনকে এতো ভালোবেসে ফেলে যে একে-ওপরকে যেন চোখে হারাতো। রজত গ্রামের এক কৃষক পরিবারের সন্তান শুধু মেধার জোরেই সে ডাক্তারিতে চান্স পেয়েছিল এবং এখন সে ডাক্তারি পাশ করে, এই হসপিটালে RMO হয়ে এসেছে বছর খানেক আগে। এখনো কোলকাতায় সেইভাবে নিজের পাকাপোক্ত বাসস্থানের ব্যবস্থা করে উঠতে পারেনি। ভবিষ্যতে নিশ্চয় সে অনেক উন্নতি করবে বলে আশা করা যায়। উর্মিও সেই বিশ্বাসের বশবর্তী হয়েই রজতের হাত ধরেছে এবং তার সারাজীবনের সঙ্গী করতে চায় রজতকে। দুই পরিবারের সম্মতিতে বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক হয়ে যায়। উর্মি যেহেতু বাবা-মায়ে একমাত্র সন্তান,আর রজতও কোলকাতায় কোনো স্থায়ী ঠিকানার ব্যাবস্থা করে উঠতে পারেনি তাই উর্মির বাবা ঠিক করেন, মেয়ে-জামাইকে যৌতুক হিসাবে একটা ফ্ল্যাট কিনে দেবেন। সেই মতো কোলকাতার প্রাণকেন্দ্রে উর্মি-রজতের জন্য একটা ফ্ল্যাট কিনে দেন তিনি । সেই ফ্ল্যাট টাকে নিজেদের মতো করে ডেকোরেশন করতেও শুরু করে দেয় তারা। বিয়ে করে ওই ফ্ল্যাটেই উঠবে দুজনে, ওখানেই নতুন সংসার পাতবে উর্মি-রজত এটাই ঠিক হয়। সেইসঙ্গে চলতে থাকে বিয়ের কেনাকাটাও। তাদের চোখে নানান স্বপ্ন ডানা মেলে ঘুরে বেড়ায় , নতুন সংসার কিভাবে সাজাবে, কে কিভাবে কোন দায়িত্ব পালন করবে, এই সব নিয়ে তাদের আলোচনা ও খুনসুটির শেষ নেই।
এদিকে বিয়ের দিনও এগিয়ে আসছে, উত্তেজনার পারদ ও বেড়ে চলেছে ওদের , কেনাকাটা ও প্রায় শেষের পথে।বিয়ের বেনারসি, গয়নাগাটি ,রজতের ধুতি পাঞ্জাবী ও অন্যান্য সব জিনিসপত্র নিজেই পছন্দ করে কিনেছে উর্মি। বিয়ের আর মাত্র তিন দিন বাকি, টুকিটাকি কিছু কেনাকাটা করতে বেরোয় রজত আর উর্মি। বাজারে গিয়ে উর্মি অসুস্থ বোধ করে, সঙ্গে সঙ্গে রজত তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনে। বাড়ি ফিরে একটু সুস্থ বোধ করে তখনকার মতো। কিন্তু রাত্রিবেলা ভীষণ জ্বর ও শ্বাসকষ্ট শুরু হয়, বাধ্য হয়ে তাকে হসপিটালে ভর্তি করতে হয়। উর্মির সব ডাক্তার আঙ্কেলরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানতে পারেন, উর্মির ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়া হয়েছে। হঠাৎ বজ্রঘাত পড়ার মতো সবাই হতবাক। উর্মির বাবা-মা , হবুবর রজত, আত্মীয় সজন, বন্ধু বান্ধব সবার যেন দিশেহারা অবস্থা। ডাক্তার আঙ্কেলরা তাকে সুস্থ করতে দিন-রাত এক করে, আপ্রাণ চেষ্টা চলিয়ে গেলেন। কিন্তু বিধাতাপুরুষ নিষ্ঠুরভাবে তাঁদের হারিয়ে দিয়ে উর্মিকে নিয়ে চলে গেলেন তাঁর কাছে। ডাক্তার আঙ্কেলদের সব চেষ্টা ব্যার্থ করে উর্মি চিরবিদায় নিল ঠিক বিয়ের পরের দিন, কন্যাবিদায়ের দিন। যেখানে আনন্দাশ্রুতে বিদায় জানানোর কথা, সেখানে কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে বদলে গিয়ে শোকাশ্রুতে বিদায় দিতে হলাে মেয়েকে ।একেবারে শ্মশান ঘাটে মেয়েকে আগুনে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাড়খাড় (ছাই)করে চোখের জলে শেষ বিদায় জানাতে হয়েছিল প্রিয়জনদের। (ঘটনাটা একদম বাস্তব, আমার খুব কাছের একজন, শুধু নাম পরিচয় পাল্টে দেওয়া হল)।ধন্যবাদ।
No comments yet.