ছোট এক শহর। গগনচুম্বনকারী বাড়ির পর বাড়ি ছুঁয়ে এঁকেবেঁকে রাস্তা গুলি দিগন্তে মিশে গেছে। ঘন বর্ষার রাত। রাস্তাঘাট জনমানবহীন। সবে সন্ধ্যে, কিন্তু মাঝরাতের সঙ্গে কোনো পার্থক্য ছিল না। বাইরে ব্যাঙের উচ্চ গোঙানি ডাক। সঙ্গে ঝিঁঝিঁ পোকারাও তাল মিলিয়ে চলেছে। আজকের আকাশ যেন তার পথ হারিয়ে বিবর্ণ অন্ধকারে স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে কেঁদে চলেছে। আমরা মাত্র তিনজন আজকের আড্ডায় উপস্থিত। আমরা বলতে আমি, নিতান্ত ও কমলেষ। কথা হচ্ছিল আমাদের বন্ধু চিন্তন কে নিয়ে, প্রায় দশ-বারো দিন আমাদের আড্ডায় অনুপস্থিত। ওর ডায়রিয়া হয়েছে,পেটের ব্যথায় ঘরে কাতরাচ্ছে। কিছু ঠিকঠাক খেতেও পারছে না। শহরতলীর এক নামকরা ডাক্তার তাকে দেখছে। আমাদের আড্ডাটি বসে শ্যামপুর পাঁচ মাথা মোড়ের একটি ভগ্নপ্রায় বাড়িতে, একবার দাদুর কাছে শুনেছিলাম বহু বছর আগে এই বাড়িতে এক তোজারতি ব্যবসায়ী থাকত। কোন আর্থিক বিভ্রাটের কারণে এই স্থান ত্যাগ করে ও পরবর্তীতে তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। তারপর থেকে এখানে পাড়ার লোকেদের আড্ডার জায়গা হয়ে গেছে। বাড়িটির পূর্ব দিকে একটি মাত্র জানালা ও তার ঠিক বিপরীত দিকে একটি ঘুন ধরা শাল কাঠের দরজা বর্তমান। জানালার বাঁদিকের কিছুটা সিমেন্টের প্রলেপ খসে পড়ে উন্মুক্ত হয়েছে। হঠাৎ খেয়াল পরল, তখন অনেকটা রাত হয়ে গেছে এবার বাড়ি ফিরতে হবে। দরজা খুলতেই যে দৃশ্য চোখে পড়ল সঙ্গে সঙ্গে দরজা বন্ধ করে দিতে হলো। বাইরে এতটাই অন্ধকার পৃথিবী যেন চোখ বুজে ফেলেছে। তার সঙ্গে চলছে আকাশ ভাঙ্গা ধারাবাহিক বৃষ্টি। রাস্তায় হাঁটুখানেক জল জমেছে, ছাদের এক কোনা দিয়ে টুপটুপ করে জল পড়ছে। সবার মনের মধ্যে সৃষ্টি হচ্ছে এক ক্লান্তিকর বিভীষিকা । রাত ক্রমশ বাড়ছে কিন্তু বৃষ্টি থামার নামই নেই। একটি ছোট মোমবাতি ছিল নিতান্তর কাছে। বৃষ্টি বাদলার দিনে বিদ্যুতের ভোগান্তির কারণে বাড়ির জন্য সে একটি মোমবাতি কিনেছিল। সেই বাতিটি জ্বালিয়ে ঘরে হালকা আলো ফুটল। ঝড়ের দমকা হাওয়ায় মোমবাতির শিখাটি মাঝে মাঝে হাওয়ায় দপ্ করে নিভে যাচ্ছে,ঘরের ভিতরে একটা আলো আঁধারি পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। বাইরে বৃষ্টি ক্রমশ বেড়ে চলেছে, হঠাৎ নিতান্ত কমলেষকে বলল তুই একটা গল্প বল। কমলেষ গল্প বলতে খুব ভালোবাসে। সে কোন কথা না বলেই পুরানো রাজপ্রাসাদের এক কাহিনী নিয়ে বলা যেইনা শুরু করল ঠিক সেই সময় একটা হাড় কাঁপানো প্রচন্ড জোরে বজ্রপাত পড়ায় সবাই নিস্তব্ধ হয়ে গেলাম কিছু মুহূর্তের জন্য । চিন্তন খুবই সাহসী প্রকৃতির ছেলে কিন্তু ওর ভয়টা আমাদের সায় দিল না। ওর গায়ের লোমগুলো কি রকম খাড়া হয়ে গেছে, গলার কণ্ঠস্বরও কেমন যেন ঝাপসা ঝাপসা হয়ে গেছে।আমাদেরও গা-হাত-পা শিরশির করছে। আমরা ক্রমশ একে অপরের কাছে এগিয়ে ঘ্যাঁসাঘেঁসি হয়ে বসলাম । বৃষ্টি থামল, কোনো ঘড়ি না থাকায় সময়টাও ঠিক বুঝতে পারছি না। অর্ধেক জ্বলে যাওয়া সেই বাতিটি জ্বালিয়ে আমরা বাড়ির দিকে রওনা হয়েছি। কিছুটা এগিয়ে এক বৃদ্ধের সাথে দেখা হয়। বৃদ্ধটি হঠাৎ জিজ্ঞেস করল --কে বাছা তোমরা,এই ঝড় বৃষ্টির রাতে উন্মুক্ত অঞ্চলে কি করছো? বৃদ্ধটির হাতে একটি অমসৃণ রুক্ষ লাঠি এবং কাঁধে একটি ঝোলা। তার মুখটা কেমন শুষ্ক শির্ণ বলিরেখা যুক্ত। কমলেষ বৃদ্ধটিকে জিজ্ঞেস করল --আপনি এই সময় এখানে কেনো? বৃদ্ধটি হাসতে হাসতে বলল --তোমাদের মত আমিও একদিন এরকমই ছিলাম আজ আর নেই। কথাটা কেমন বিস্মিত লাগল। কমলেষ মনে মনে কিছু বিড়বিড় করছিল। আমার মনের মধ্যেও একটা খটকা লাগছিলো কিন্তু রাত হয়ে যাওয়ার কারণে আর কথা বারালাম না। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে ঘটনাটি শুনে চোখ কপালে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে নিতান্ত ও কমলেষকে খবর দিলাম। তারাও এই খবর শুনে হতভম্ব হয়েগেছে। কিভাবে ঘটতে পারে!গতকাল রাতে যে বৃদ্ধ লোকটির সঙ্গে দেখা হয়েছিল সেই মানুষটি সন্ধ্যায় বজ্রপৃষ্ঠ হয়ে মারা গেছে। শ্যামপুর পাঁচমাথা মোড় থেকে ঠিক উত্তর দিকে গিয়ে বড়ো রাস্তার একটি পোস্টারের কাছে তার মৃতদেহ পাওয়া যায়। চাক্ষুষ তাকে দেখে নিজেকে নিজে যেন অপরিচিত মনে হচ্ছে। সারাদিন মনের মধ্যে এক উৎকণ্ঠা ও হতাশতা তারা দিয়ে বেড়াচ্ছে। ঠিক দুপুর দুটো নাগাদ চিন্তনের অত্যাধিক জ্বরের কারণে তাকে স্থানীয় এক হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। আমি ও কমলেষ এই ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করছিলাম --ঘটনাটি চিন্তনের ওপর ভালোই প্রভাব ফেলেছে বল --হবারই কথা --আমারও গা টা কেমন জ্বর জ্বর লাগছে। তারপর কতদিন কেটে গেছে,পুরো ঘটনাটা আমাদের কাছে এখনো অস্পষ্ট হয়ে রয়েছে। একবার মনে হচ্ছে আমরা কি ভুল দেখেছি, আবার এটাও মন চাইছে না যে এটা একটা ভৌতিক ঘটনা। এই পুরো ঘটনাটি একটা রহস্যতায় ঢাকা এক গল্প হয়েছে রয়ে গেছে।।
No comments yet.