সখের রাখাল
রেটিং: 0.0 ★ | লাইক: 2 | পাঠসংখ্যা: 162
বিথির মায়া ছিল গরুগুলোর উপর। কখনো নিজেই ঝোপঝাড় থেকে লতাপাতা, ঘাস এনে খাওয়াতো। গরুগুলোও ওকে দেখলেই ডাক দিত। দাদা হেসে বলত,
— “দেখ, গরুগুলো তোকে ডাকছে, যা ঘাসপাতা এনে দে ওদের।”
স্কুল ছুটির দিনে, পাড়ার বন্ধুদের নিয়ে সে মাঝে মাঝেই গরু চড়াতে যেত দূরের মাঠে। কিন্তু এসব মাঠ ছিল অনেক দূরে — প্রায় দুই-তিন মাইল কিংবা তারও বেশি। তার উপর মাঠের দুই পাশে ছিল বিশাল শ্মশানঘাট। প্রায় প্রতিদিনই মরা পোড়ানো হতো সেখানে। কখনো একসঙ্গে অনেক মৃতদেহ এলে, বিথির বুক কেঁপে উঠত ভয়ে।
বন্ধুরা তখন ওকে ঘিরে ধরত, বলত,
— “ভয় পাস না, আমরা আছি।”
আর বিথি বলত,
— “তোরা হরে কৃষ্ণ, হরে কৃষ্ণ নাম কর! আমার খুব শরীর খারাপ লাগছে।”
ওরাও একযোগে হরিনাম জপতে শুরু করত। একটু শান্তি পেত বিথি। কিন্তু মনে মনে ভাবত,
— “আর কখনো এই মাঠে গরু চড়াতে আসব না।”
তবু, গরুগুলোর প্রতি অদ্ভুত এক টান ওকে বারবার ফিরিয়ে আনত।
এক গরমের ছুটিতে, গরু চড়াতে গিয়ে হঠাৎ আকাশ কালো করে এলো। মেঘ নেমে এলো একেবারে মাথার ওপরে — যেন কেউ একখানা কালো ত্রিপল টাঙিয়ে দিয়েছে। চারদিক অন্ধকার হয়ে গেল। হঠাৎ ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলো, সঙ্গে তীব্র বজ্রপাত। গরুগুলো পাগলের মতো লেজ তুলে দৌড়াতে লাগল। সবাই দিশেহারা — কে কোথায় গেল, বুঝে উঠার উপায় নেই।
বৃষ্টি যেন সুঁচ হয়ে বিথির ছোট্ট শরীর বিদ্ধ করছিল। বন্ধুরা সবাই ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। কেউই আর কারো কথা শুনছে না।
ভয়ে দিকবিদিক জ্ঞান হারিয়ে বিথি দৌড়াতে লাগল — দৌড়াতে দৌড়াতে পৌঁছে গেল এক শ্মশানের ধারে। সেখানে মৃতদেহ পড়ে আছে, চিতা সাজানো, কিন্তু এখনো দেহ তোলা হয়নি। দৃশ্যটা দেখে বিথির বুকটা যেন থেমে গেল। তীব্র আতঙ্ক আর আঘাতে ছুটতে লাগল সে, প্রাণপণে।
অবশেষে শ্মশানের আরেক প্রান্তে দেখা মিলল ওর সাথি পুন্নির। দু’জনের চোখে-মুখে ভয়, গায়ে জখম, কিন্তু একে অপরকে দেখে যেন প্রাণ ফিরে পেল।
বৃষ্টি তখনো অঝোরে পড়ছে। তারা দৌড়াতে দৌড়াতে পৌঁছে গেল এক অচেনা গ্রামে। গায়ের কাঁপুনি আর ক্লান্তিতে জর্জরিত, তারা একটার পর একটা দরজায় কড়া নাড়তে লাগল। কিন্তু কেউ শুনল না, খুলল না।
শেষে এক বাড়ির তালপাতার ছাউনি দেওয়া বারান্দায় আশ্রয় নিল ওরা। শরীর কাঁপছে, মুখে কোনও শব্দ নেই — কেবল চোখে আকুতি।
সেই সময় ওই বাড়ির গৃহকর্তা দরজা খুললেন। বিথি আর পুন্নির অবস্থা দেখে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। সঙ্গে সঙ্গে ভিতরে নিয়ে গিয়ে গামছা, গরম দুধ, আর উনুনের তাপ দিয়ে মেয়েদুটিকে আশ্রয় দিলেন। গৃহবধূ তাদের জামাকাপড় নিংড়ে রোদে মেলে দিলেন, আর নিজের হাতে চুলে বিলি কেটে দিলেন উষ্ণতা।
বৃষ্টি থামতে অনেকটা সময় লেগেছিল। তারপর আধভেজা জামা গায়ে দিয়ে, তারা বাড়ি থেকে কৃতজ্ঞ মনে বিদায় নিল।
পথে গরুগুলোর খোঁজে গিয়ে দেখে — আশ্চর্য! লালু আর কালু তখনও শ্মশানের গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে, বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে।
সে এক বিজয়ীর মতো ফিরে আসা। ঘরে ফিরেই বিথি প্রতিজ্ঞা করেছিল —
"জীবনে আর কখনো সেই মাঠে পা রাখবো না।"
তবু তার মনে চিরকাল গেঁথে থাকবে সেই একরাশ ভালোবাসা — অচেনা মানুষদের মানবিকতা, গরুগুলোর প্রতি দায়বদ্ধতা, আর জীবন বাঁচার মরিয়া চেষ্টা।
শেষ কথা:
গরু চড়ানোর সখে রাখাল সাজা হয়েছিল বিথির, কিন্তু সেই দিন সে বুঝেছিল প্রকৃতি, ভয়, আর মানুষের দয়া – এই তিন মিলে জীবনকে গড়ে তোলে নতুনভাবে।
No comments yet.