তালগাছটার নিচে
রেটিং: 0.0 ★ | লাইক: 2 | পাঠসংখ্যা: 56
নদীর ধারঘেঁষা এক গ্রাম—যমযম ঘাট। এখানে সময়ের গতি যেন একটু ধীর।
এই গ্রামের শেষ মাথায় একটা তালগাছ, তার নিচে বাঁধানো একটা পুরনো পাটির মতন বসার জায়গা।
আর তারই এক পাশে থাকে চম্পা—৬৫ বছরের বিধবা নারী, যাঁর চোখে প্রতিদিন সেই একই পথের পানে চেয়ে থাকার অভ্যেস।
প্রতিদিন বিকেলে, ঘর থেকে একটা কাঠের বাটি হাতে নিয়ে বেরিয়ে আসেন, তালগাছটার নিচে বসেন, আর চেয়ে থাকেন মাঠ পেরিয়ে রাস্তাটার দিকে।
কেউ কিছু বললে বলেন—
“অপেক্ষা করি... সে ফিরে আসবে একদিন।”
২
কে সে?
অরুণ, তার ছেলে।
দশ বছর আগে শহরে কাজে গিয়েছিল, তারপর আর ফিরে আসেনি।
না কোনো চিঠি, না কোনো ফোন।
লোকজন বলেছিল, “শহর গিলে খায় রে মা... ভুলে যায়।”
কিন্তু চম্পার মুখে একটাই উত্তর,
“যে ছেলে আমার মুখে নিজে হাতে ভাত তুলে দিত, সে কি আমায় ভুলে যাবে?”
তিনি বিশ্বাস করেন, কোনো একদিন হঠাৎ সকালে বা বিকেলে রাস্তার ওই বাঁক ঘুরে ছেলেটা ফিরে আসবে।
৩
এই বিশ্বাসেই তিনি প্রতি বছর পয়লা বৈশাখে তালগাছের নিচে পিঠে বানান।
কারণ ছোটবেলায় অরুণ বলেছিল—
“মা, একদিন পয়লা বৈশাখে ফিরে আসব। তোমার হাতে বানানো পাটিসাপটা খাব।”
লোক হাসে। পাড়ার ছোট ছেলেমেয়েরা বলেও—
“ঠাম্মি, তোমার ছেলে তো এসেছে স্বপ্নে, আসলেই আর আসবে না।”
চম্পা হেসে বলেন—
“ভালোবাসা কি কেবল স্বপ্নে থাকে রে? সে একদিন ঠিকই হাঁটবে এই ধুলোর পথ বেয়ে।”
৪
একদিন পাড়ার ডাক্তারবাবু এলেন, বললেন—
“চম্পাদি, আপনার হার্টে ব্লক ধরা পড়েছে। এখন বিশ্রাম দরকার।”
চম্পা তখনও হেসে বলেছিলেন—
“না রে ডাক্তারবাবু, আমি মরব না এখন। আমি তালগাছটার নিচে শেষ পাটিসাপটা না খাওয়ানো পর্যন্ত মরব না।”
৫
তারপর হঠাৎ একদিন...
সেই বিকেলটাও ছিল অন্যরকম।
আকাশে ধুলো জমা মেঘ, গাছে হাওয়া নেই।
চম্পা আগের মতোই তালগাছের নিচে এসে বসেছেন। চোখ একটু বেশি চুপচাপ আজ।
হাতটা বাটির ওপর রাখা।
অবিকল সেই সময়েই, মাঠ পেরিয়ে একটা যুবক আসতে থাকে—হাঁটুতে ধুলো, চোখে অপরাধবোধ, হাতে ছোট একটা কাপড়ের ব্যাগ।
চম্পা দাঁড়িয়ে যান। তারপর চোখ মেলে তাকিয়ে বলেন—
“অরুণ?”
ছেলেটি জবাব দেয় না।
শুধু হাঁটু গেঁড়ে বসে, তার মায়ের পায়ের ওপর মাথা রাখে।
চম্পা মাথায় হাত রাখেন, ঠোঁট কাঁপে—
“তুই এলি রে... ঠিক বলেছিলাম... ভালোবাসা শুধু স্বপ্ন না, একদিন ঠিকই ফিরে আসে।”
৬
সেই তালগাছটা আজও আছে।
আর তার নিচে বাঁধানো পাটির উপর লেখা—
“মায়ের অপেক্ষা হার মানে না,
ভালোবাসা ঠিকই ফিরে আসে।
tukludas05 (July 24, 2025)
একদম👍 মায়েরা সহজে হার মানে না।